
বাংলাদেশের পান ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে রপ্তানির ক্ষেত্রে জটিলতা শিগগিরই কাটছে না। এ দেশ থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি হওয়া পানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া স্যালমোনেলার অস্তিত্ব পাওয়ায় দেশগুলোতে পান রপ্তানিতে বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত রয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর ইইউকে চিঠি দিয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। তবে এ বিষয়ে এখনো সাড়া দেয়নি ইউরোপের দেশগুলোর এ জোট।
জানতে চাইলে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান সুভাশীষ বসু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ইইউকে একটি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’ তিনি বলেন, ইইউর কাছ থেকে সাড়া পেয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। পান ব্যাকটেরিয়ামুক্ত হয়েছে কি না সেটা যেন ইইউ পরীক্ষা করতে পারে, সে জন্য একটি চালান পাঠানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
ইপিবির চিঠি পাওয়ার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশে ইইউর কার্যালয়ের বাণিজ্য উপদেষ্টা জিল্লুল হাই রাজী। তিনি বলেন, ‘ইইউ এখনো আগের অবস্থানেই আছে। ইইউ এসব ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চিঠিপত্রকে। কারণ তারাই সবজি-ফল রপ্তানির স্বীকৃতি দেয়। সবজিতে রোগবালাই আছে কি না শনাক্ত ও দূর করতে পারে ডিএই। কিন্তু তারা স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া দূর করতে পারে না।’
স্যালমোনেলার অস্তিত্ব পাওয়ায় ইইউর র্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড (আরএএসএফএফ) গত ২৯ জুলাই এ দেশ থেকে পান আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ৩০ জুন। এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় পান আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইইউ। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ছিল ৩১ জুলাই পর্যন্ত। সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই তা আরও এক বছর বাড়ানো হয়।
অবশ্য বাংলাদেশ ফল, সবজি ও এ-সংক্রান্ত পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিএফভিএপিইএ) উপদেষ্টা মনজুরুল ইসলামের দাবি, পান থেকে স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া দূর করার পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। তাদের পক্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক বাহানুর রহমান এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, ইইউ এখনো ইপিবির চিঠির কোনো জবাব দেয়নি। সে কারণে ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ইইউর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না তা জানাতে অনুরোধ করে ব্রাসেলসে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কনস্যুলারের কাছে গত মঙ্গলবার চিঠিও দিয়েছে সংগঠনটি।
ইপিবির চিঠি: ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পান রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদের (বর্তমানে অর্থসচিব) সভাপতিত্বে গত ৭ আগস্ট ওই মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ করে ইইউতে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইপিবি ব্রাসেলসে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কনস্যুলারকে চিঠি দেয়। একই চিঠি দেওয়া হয় ইইউর বাংলাদেশ কার্যালয়েও। চিঠিতে বলা হয়, দেশের একজন খ্যাতিমান মাইক্রোবায়োলজিস্ট পান থেকে স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া সফলভাবে দূর করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এমন পানের কিছু নমুনা মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য লন্ডনের স্যালমন অ্যান্ড সিবার লিমিটেডের কাছেও পাঠানো হয়। সংস্থাটি পান পরীক্ষা করে তাতে স্যালমোনেলার অস্তিত্ব পায়নি।
চিঠিতে ইইউর বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের এ দেশে এসে সরেজমিনে পান থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর করার বিষয়টি দেখার জন্য আসতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
তবে বাংলাদেশে ইইউ কার্যালয় সূত্র বলছে, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের মাসে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে। তখনই সিদ্ধান্ত হবে পান রপ্তানির নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও বাড়বে না প্রত্যাহার করা হবে। এর আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা খুবই কম।
ইস্যু এখন সুশাসন: ইইউ কার্যালয় সূত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সবজির আড়ালে ইউরোপে পান রপ্তানির চেষ্টা চালানো হয়েছে। এমন বেশ কয়েকটি চালান ধরাও পড়ে। সর্বশেষ ২৯ জুলাই হিথ্রো বিমানবন্দরে এমন একটি চালান ধরা পড়ে।
ইইউর আগেই গত বছরের ১৫ মে বাংলাদেশ সরকারও এ দেশ থেকে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পান রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপের দেশগুলোতে পান রপ্তানি হয়। তখন অবশ্য ইইউভুক্ত দেশগুলো সেই পান তাদের দেশে ঢুকতে দিয়েছে।
পানের ব্যাকটেরিয়া দূর করার পরও ইইউ তাদের অবস্থান থেকে কেন সরে আসছে না—জানতে চাইলে জিল্লুল হাই রাজী বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথমে নিজেরা ইউরোপে পান রপ্তানি বন্ধ করল। তখনো পান রপ্তানি হয়েছে। আবার যখন ইইউ পান রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল তখনো পান রপ্তানি হয়েছে। এটা কীভাবে হয়? ডিএইর সনদ ছাড়া কীভাবে পান রপ্তানি হয়? এখানে আসলে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।’
রপ্তানি চিত্র: সবজি রপ্তানিকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পানের অর্ধেকই যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। আর ৪৫ শতাংশ যায় ইউরোপের দেশগুলোতে। বাকি ৫ শতাংশ যায় অন্যান্য দেশে। বেশি পান রপ্তানি হয় যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদি আরব ও দুবাইতে।
পানের জন্য আলাদা এইচএস কোড নেই। পান রপ্তানি হয় ফুল ও পাতা (কাট ফ্লাউয়ার অ্যান্ড ফলিয়েজ) বিভাগের আওতায়। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ফুল ও পাতার আওতায় যত পণ্য রপ্তানি হয় তার ৯০ শতাংশই হচ্ছে পান।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ইইউতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে গত বছর পান রপ্তানি কমে গেছে। গেল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ফুল ও পাতার আওতায় পণ্য রপ্তানি হয়েছে তিন কোটি ৯৩ লাখ ডলারের। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে চার কোটি ১৪ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে পাঁচ কোটি চার লাখ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে চার কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ দেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরবেই গেছে ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য।
‘‘ইইউ পান রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল, তখনো পান রপ্তানি হয়েছে। এটা কীভাবে হয়? ডিএইর সনদ ছাড়া কীভাবে পান রপ্তানি হয়? এখানে আসলে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।’
জিল্লুল হাই রাজী
বাণিজ্য উপদেষ্টা,
ইইউর কার্যালয়, বাংলাদেশ