
পঞ্চমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে আশাবাদ ব্যক্ত করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চার বছর ধরে এ বিষয়ে প্রায় একই প্রতিশ্রুতি এবং একই আশাবাদের কথা শুনিয়ে আসছেন তিনি। বাস্তবে চার বছরে পিপিপি আইনই প্রণয়ন করতে পারেনি সরকার।
পিপিপি হচ্ছে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের চুক্তি হয় বা বেসরকারি খাতকে সেবা তৈরির জন্য সরকার নিবন্ধন দিয়ে থাকে।
পিপিপি উদ্যোগে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণ, মালিকানা, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওওটি); নির্মাণ, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওটি) এবং নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা (বিওও)-এ তিনটি পদ্ধতি রয়েছে।
সরকারের প্রথম বছর ২০০৯-১০ অর্থবছরে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পর থেকে প্রতিবছরই পিপিপির জন্য তিন হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ রেখে আসছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারের বাজেট বক্তব্যে আর আলাদা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করেননি তিনি।
অর্থমন্ত্রী এবারের বক্তব্যে পিপিপি, বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগজনিত ব্যয় বাবদ সামগ্রিক ব্যয়কাঠামোর ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।
বাণিজ্যিকভাবে আপাতত অলাভজনক কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিপিপি প্রকল্পগুলোতে ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং (ভিজিএফ) এবং পিপিপি প্রকল্পের কারিগরি সহায়তা বাবদ এ অর্থ ব্যয় হবে।
বর্তমান সরকারের প্রথম অর্থবছরে আলাদা একটি অবস্থানপত্র উপস্থাপন করে অর্থমন্ত্রী এর নাম দিয়েছিলেন ‘নবউদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’। সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও এ প্রয়াস কোনো কাজে আসেনি।
তবে এবারের বাজেট বক্তব্যে কিছুটা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পিপিপি নিয়ে আমি প্রথম বাজেট বক্তব্যেই অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করি। দ্বিতীয় বছরে এ বিষয়ে নীতিমালা ও কৌশল প্রণয়ন সম্ভব হয়। নতুন দপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই এ কার্যক্রম দেরিতে শুরু হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৩ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত করার কৌশল হিসেবে অবকাঠামো খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। অবকাঠামো উন্নয়নে কালোটাকা বা অপ্রদর্শিত আয় সাদা করার সুযোগ দিয়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে একটি বন্ড ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই বন্ড আর আসেনি। ‘বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতা প্রতিবেদন (জিসিআর) ২০১০-২০১১’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বের সর্বনিম্ন ১০টি দেশের অন্যতম বাংলাদেশ।
প্রতিশ্রুতি অপূরণ ও অসত্য ভাষণ: নাম উল্লেখ না করে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আটটি বড় প্রকল্প পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিপি) রাখা হয়েছিল ১০টি প্রকল্প।
গতকালের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, গত মে মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত ৩০টি পিপিপি প্রকল্প নির্ধারিত হয়েছে, তালিকাভুক্ত হয়েছে ১৭টি, উপদেষ্টা নিযুক্তি হয়েছে ১৪টিতে এবং কার্যক্রম শুরু হয়েছে ছয়টিতে।
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এ তথ্য ঠিক নয়। পিপিপি কার্যালয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ—এ দুই পিপিপি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আর উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে মংলা বন্দরে দুই জেটি নির্মাণসহ চার প্রকল্পে।
১৭ প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়েরও হিসাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তালিকাভুক্ত এ প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হবে ৬৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।