ব্যাংক ঋণ বিতরণের একমাত্র চ্যানেল নয়

বাংলাদেশের জন্য কোনটা ভালো? সর্বাত্মক লকডাউন নাকি ঢিলেঢালা? অর্থনীতির জন্য কোনটা ভালো? ঢিলেঢালা লকডাউন নাকি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি? লকডাউন এক সপ্তাহের নাকি দুই সপ্তাহের? অনেক প্রশ্ন? আসলে অর্থনীতির মানুষেরা কী চান? কী তাঁদের বিশ্লেষণ? নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী—এ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন।

সোহেল আর কে হুসেইন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেঘনা ব্যাংক
সোহেল আর কে হুসেইন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেঘনা ব্যাংক

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পুরোপুরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। লকডাউনের কারণে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে। চলমান লকডাউনে সেটা আরও বাড়বে। কর্মক্ষেত্রে যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রেখে কাজ চালানো যায়, সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ। পাশাপাশি বেসরকারি খাত যদি নিজেদের উদ্যোগে কর্মীদের নিয়মিত পরীক্ষা করায়, তাহলে ভালো হয়। অর্থনীতি বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা—সবকিছুর জন্য টাকাপয়সা প্রয়োজন। তাই ব্যাংক ছাড়া কোনো কিছুই চলবে না। এ জন্য ব্যাংক বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংকারদের একটু বাড়তি ঝুঁকিও নিতে হয়। এ জন্য ব্যাংকারদের মধ্যে আক্রান্তও বেশি। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব টিকা নিতে হবে।

বর্তমানে করোনার যে প্রকোপ চলছে, তার তীব্রতা কেমন হয়, তা দেখতে হবে। মাসের পর মাস তো এখনকার মতো চলতে পারে না। টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হবে। আমাদের এখনই দেখতে হবে, কত দিনে আমরা বড় জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছি। সেভাবে চিন্তা করে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি অর্জনে নতুন করে প্রকল্প নিতে হবে। বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য। এসএমই পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে। এখনই দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েও ভাবতে হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে এক মাসের মধ্যে করোনার প্রকোপের তীব্রতা কেমন হয়, তার ওপর। আমরা বিদেশি সহযোগী সংস্থা থেকে বিভিন্ন ঋণ ও সহায়তা পাচ্ছি, তার ব্যবহার যথাযথ ও দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য তদারকি বাড়াতে হবে।

গত কয়েক দিনে ব্যাংকে অনেক লেনদেন হয়েছে। লকডাউন যদি আরও চলে, তাহলে ব্যাংকগুলোকে এসএমইসহ অন্য উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন করে ঋণ দেওয়া শুরু করতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর কাছে তারল্য আছে। ব্যাংকগুলো প্রণোদনা প্যাকেজে অংশ নিতে পারবে। তবে এর চেয়ে বড় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সমর্থন।

আমি মনে করি, শুধু ব্যাংকই ঋণ বিতরণের একমাত্র চ্যানেল মনে না করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাকে নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ, তারা আরও প্রান্তিক পর্যায়ে যেতে পারে। মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি আরও বেশি। কে কত গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারে, এভাবেই চিন্তা করতে হবে।

গত তিন মাসে ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। আমদানি কমে গেছে, রপ্তানিতেও অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। এখন প্রণোদনা ঋণের বাইরে অন্য ঋণ নেই। এই সময়ে ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো কোনো প্রকল্পে যাচ্ছে না। বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে, তাতে এটা স্বাভাবিক। তবে পুরোনো গ্রাহকদের দিকে আমাদের নজর বাড়াতে হবে। তারল্যের চাহিদা ও সরবরাহের কারণে ঋণের সুদ ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তবে বড় অংশ আমানতকারীর দিকে আমাদের দেখতে হবে, যারা সুদের ওপর নির্ভরশীল। মূল্যস্ফীতির পর যেন তাদের হাতে কিছু থাকে।