জিইয়ে রাখা সমস্যার মধ্যে রয়েছে বৈষম্য ও বঞ্চনা। নতুন সমস্যা, মানুষের সুরক্ষা ও কোভিড-১৯-এর মতো মহামারি।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাস এগিয়ে যাওয়ার। কিছু উত্থান-পতন থাকলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল মানব উন্নয়নের চেষ্টা। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা জিইয়ে রাখা সমস্যা। নতুন সমস্যাও সামনে আসছে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সম্মেলনের তৃতীয় দিনে গতকাল বুধবার বক্তারা এসব কথা বলেন। তাঁদের চোখে, বড় সমস্যার মধ্যে রয়েছে বৈষম্য ও বঞ্চনা। গভীর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা। নতুন সংকট হলো করোনার মতো মহামারি।
‘বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর: অতীতে দৃষ্টিপাত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সিপিডির এই ভার্চ্যুয়াল সম্মেলনের তৃতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন ছিল সমাজের রূপান্তর নিয়ে। এর চেয়ারপারসন ছিলেন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ বীণা আগারওয়াল।
এই অধিবেশনে বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, দেশে নাগরিক সমাজের কাজের সুযোগ ক্রমশ কমে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের ভাবমূর্তিও আর আগের মতো নেই।
এই অধিবেশনে তিনটি উপস্থাপনার একটি ছিল অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহানের। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই উন্নয়নের দৃষ্টান্ত। কিন্তু বৈষম্য আর বঞ্চনা থেকে গেছে।
সেলিম জাহানই বাংলাদেশের সামনে তিন ধরনের ঝুঁকির কথা বলেন। প্রথমত, জিইয়ে থাকা সমস্যা। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলা আসা বৈষম্য ও বঞ্চনা। যেমন বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে সেবার পরিধি বেড়েছে। কিন্তু মানসম্পন্ন সেবা দরিদ্ররা পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, ক্রমশ গভীর হতে চলা সমস্যা। এর মধ্যে বৈষম্যও রয়েছে। আরও রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। তৃতীয়ত, মানুষের সুরক্ষা ও কোভিড-১৯-এর মতো মহামারিজনিত সংকট।
সমাজে সহিষ্ণুতার অভাব ও সহিংসতা বাড়তে থাকা নিয়েও উদ্বেগ জানান সেলিম জাহান। তাঁর মতে, উন্নয়ন মানে কেবল পরিসংখ্যান নয়। একটা সময় মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল, তবু মানুষ অপরকে সহ্য করত, মর্যাদা দিত। এখন সমাজে তার অভাব প্রকট।
নাগরিক সমাজের কার্যক্রম নিয়ে একটি উপস্থাপনায় সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের উত্থান, কর্মকাণ্ড এবং এই সমাজ কী কী বাধার মুখে পড়ছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ নিয়ে সাধারণ ধারণা হলো, এই সমাজ বিদেশি অর্থায়নে চলে। আদতে মাত্র ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদেশি অর্থায়ন পেয়ে থাকে। এই সমাজের অস্তিত্ব স্বাধীনতার আগে থেকেই ছিল।
উদাহরণ হিসেবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, স্বাধীনতার পরপরই নাগরিক সমাজ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কাজে নেমে পড়েন। সেনাশাসনের সময় কখনো কখনো কোনো কোনো ইস্যুতে সরকার ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করেছে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই সম্পর্ক ছিল কখনো প্রতিযোগিতাপূর্ণ, আবার কখনো ছিল সহযোগিতাপূর্ণ। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রের ওপরতলার মানুষেরা (স্টেট বেজড এলিট) ক্ষমতায় ছিল এবং তাঁরা নাগরিক সমাজের সহযোগিতা পেয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই সম্পর্ক ছিল উদার। কিন্তু এর পর থেকে ক্রমশ চিড় ধরতে ধরতে রীতিমতো বিরোধপূর্ণ সম্পর্কে জড়ায় সরকার ও নাগরিক সমাজ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা থেকে বিকল্প উপায়ে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে মানুষ। বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা ফেলো সোহেলা নাজনীন বলেন, বাংলাদেশ দ্রুতই মাতৃমৃত্যু ও জন্মহার রোধ, শিক্ষা খাতে সমতা, নারী অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনগত সংস্কার ও রাজনীতিতে উপস্থিতির দিক থেকে এগিয়ে যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও সমতা ছিল না।
আলোচনায় আরও অংশ নেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের পরিচালক সাবিনা আলকায়ার, যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইলোরা শেহাবউদ্দীন ও দ্য লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড লুইস।
সিপিডি সম্মেলনটি আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির সহায়তায়। এই সম্মেলনের শেষ দিনে আজ বৃহস্পতিবার ‘উন্নয়নের ব্যয় ও চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে একটি এবং ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ’ শিরোনামের আরেকটি অধিবেশন রয়েছে।