সিলেট চেম্বারের ৫০ বছর পূর্তিতে সেমিনার

সিলেটের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে হবে প্রবাসীদের

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিলেট বিভাগ হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখানে রয়েছে শিল্পায়নের অফুরন্ত সম্ভাবনা। অথচ সিলেট অঞ্চলে প্রাপ্ত মোট ব্যাংক আমানতের মাত্র ২১ শতাংশ এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। মিল-কারখানা তেমনভাবে গড়ে উঠছে না। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেট অঞ্চলের সম্পদশালী ব্যক্তিদের যথাযথভাবে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে সিলেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। প্রবাসীদের বিনিয়োগে সিলেটে সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।

সিলেটের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘সিলেট অঞ্চলে বিনিয়োগ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারের ধারণাপত্রে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নগরের আরামবাগ এলাকার একটি কনভেনশন সেন্টারে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল গত বুধবার। গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ দিন বিকেলে সেমিনার হয়। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৈশভোজের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সেমিনারে লিখিত ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে এলাহী মোহাম্মদ ফয়সাল। এর ওপর আলোচনায় অংশ নেন সিলেটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিলেট চেম্বারের সহসভাপতি মাসুদ আহমদ চৌধুরী।

ধারণাপত্রে বলা হয়, সিলেট বিভাগের প্রায় ১৬ শতাংশ পরিবার প্রবাসীদের মাধ্যমে অর্থ পেয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের অধিবাসীরা পাঠানো অর্থ মূলত পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ, জমি কেনা, বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট কিনতে ব্যয় করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পবিত্র স্থান এবং প্রতিষ্ঠানেও প্রবাসী-আয় ব্যয় হয়। ব্যাংক আমানতের একটি বিরাট অংশ আসে প্রবাসীদের কাছ থেকে। গরিব আত্মীয়স্বজনেরাও প্রবাসী-আয় পান।

ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশের মোট প্রবাসী-আয়ের প্রায় ৯ শতাংশ সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীদের মাধ্যমে এসে থাকে। সিলেট অঞ্চলের অধিবাসীরা উৎপাদনশীল খাতে (মিল-কারখানা প্রতিষ্ঠা) বিনিয়োগ না করে অনুৎপাদনমুখী খাতে (যেমন কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, ভূমি ব্যবসা, দোকান তৈরি, বাড়ি নির্মাণ) বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ঝুঁকি গ্রহণ করে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা তেমন নেই।

ধারণাপত্রে আরও বলা হয়, এ অবস্থা কাটাতে সিলেট অঞ্চলের উদ্যোক্তারা কৃষিজাত পণ্য, চা, কুটিরশিল্প, মৎস্য ও গবাদিপশু পালন, টেক্সটাইল ও রাবারশিল্প, খনিজ শিল্প, পাথর ও ইটশিল্প, আগর-আঁতরশিল্প এবং বেতশিল্প হতে পারে সম্ভাব্য উৎপাদনমুখী খাত। এ ছাড়া প্রবাসী বিনিয়োগের খাত হতে পারে সিলেটের পর্যটনশিল্প। সিলেট অঞ্চলে বেশ কিছু আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থান খুঁজে বের করে যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে কেন্দ্রগুলোতে কৃত্রিম বিনোদনের ব্যবস্থা, পর্যটন পুলিশ প্রদান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, পর্যটকদের জন্য পরিবহনব্যবস্থা, দক্ষ জনবলের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আবাসন ব্যবস্থা, প্যাকেজ ট্যুর চালু প্রভৃতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সেমিনারে উপস্থাপিত ধারণাপত্রের ওপর আলোচনায় বক্তারা যুগোপযোগী ব্যবসার দিকে তরুণদের অগ্রসর করার ক্ষেত্রে সিলেট চেম্বারকে সাংগঠনিক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। সিলেট অঞ্চলে বিদেশমুখী প্রবণতায় শুধু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত নয়, ব্যবসা-সংক্রান্ত ধারণার অভাবও দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, সিলেট অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে প্রচুর অর্থ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসাসংক্রান্ত ধারণার অভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে না। শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অভাবে নতুন নতুন ব্যবসা উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে না।