‘মহুয়া ইলেকট্রনিকস। এখানে ঘড়ি, রেডিও, ক্যাসেট, টিভি মেরামত ও ব্যাটারি চার্জ করা হয়। স্বত্বাধিকারী: মনজুর রহমান।’ পুরোনো এই সাইনবোর্ডটির উল্টো পিঠে চড়েছে নতুন নাম ‘রাতুল আদর্শ দুগ্ধ খামার’। একসময়ের বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামতকারী মনজুর রহমান এখন সফল দুগ্ধখামারি হয়ে ওঠাতেই সাইনবোর্ডে এই পরিবর্তন।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার গুনাইগাছা ইউনিয়নের বড় শালিখা গ্রামে মনজুরের বাড়ি। বছর পাঁচেক আগে নিজের বাড়ির উঠোনে একটি গরু দিয়ে খামার করেন। এখন তাঁর খামারে গরুর সংখ্যা ১০। ৪ অক্টোবর শেষ বিকেলে সেই খামারে ঢুকতেই রাতুল আদর্শ দুগ্ধ খামারের সাইনবোর্ডটি চোখে পড়ল। একটু খেয়াল করতেই পেছনের পুরোনো লেখাগুলোও দৃষ্টি কাড়ল।
২০১০ সালের কথা। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতের কারিগরের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। প্রায়ই হাতে কোনো কাজ থাকত না মনজুরের। সে সময় প্রাণ ডেইরি চাটমোহরে দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্র চালু করে। কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন মনজুর। প্রতিযোগিতামূলক দামে প্রতিদিন দুধ বিক্রির আশ্বাস পেয়ে গরুর খামার করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
>বছরের এই সময়টাতে দুধ কম পাওয়া যায়। কারণ, বন্যার কারণে জমিজমা ডুবে যায়, সবুজ ঘাসের অভাব দেখা দেয়। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় ঘাস সংরক্ষণ করা গেলে এই সমস্যায় পড়তে হয় না
নিজের খামারের সামনে দাঁড়িয়ে এসব তথ্য দিলেন মনজুর। তিনি বলেন, ‘দুটি গরু থেকে প্রতিদিন ২৫ লিটার করে দুধ পাচ্ছি। তাতে এক হাজার টাকার ওপরে আয় হয়।’ সব মিলিয়ে আগের চেয়ে আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো বলে জানান তিনি, তাঁর ভাষায়, ‘সংসারে আর অভাব-অনটন নাই আমার।’
মনজুরের মতো চাটমোহরে প্রাণ ডেইরির নিবন্ধিত বা চুক্তিভিত্তিক খামারি আছেন ২ হাজার ৮৭২ জন। তাঁরা প্রাণের দুধ সংগ্রহকেন্দ্রের বিভিন্ন পয়েন্টে দৈনিক প্রায় ৩৮ হাজার লিটার দুধ দেন। পরে সেই দুধ বিশেষ গাড়িতে করে নরসিংদীর পলাশে প্রাণের কারখানায় আনা হয়। সেখানে ইউএইচটি (আলট্রা হিট ট্রিটমেন্ট) ও পাস্তুরিত তরল দুধ, গুঁড়ো দুধ, দই, ঘি, মাখন, পনির, লাচ্ছি দই ইত্যাদি দুগ্ধজাত খাবার উৎপাদন করা হয়।
প্রাণ ডেইরি প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এ জন্য পাবনার চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও বাঘাবাড়ি এবং রংপুরে প্রাণের হাব রয়েছে। এসব হাবের অধীনে থাকা ১২৪টি দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্রে ১২ জেলার খামারিরা দুধ দেন।
চাটমোহর দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, দুধ সংরক্ষণের জন্য পাঁচটি বিশাল আকৃতির ট্যাংক বসানো হয়েছে। প্রতিটি ট্যাংকে ৫ হাজার করে মোট ২৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা যায়। দুই বেলায় মোট ধারণক্ষমতা দাঁড়ায় ৫০ হাজার লিটার। ট্যাংকে প্রতিবার দুধ রাখার আগে দুধের ফরমালিন, অ্যালকোহল, সোডা, ফ্যাট (চর্বি) প্রভৃতি পরীক্ষা করা হয়। চাটমোহর কেন্দ্রের অধীনে দুধ সংগ্রহের জন্য আছে ২১টি পয়েন্ট। মূলত এই পয়েন্টগুলোতেই সকাল-বিকেল দুধ দেন স্থানীয় খামারিরা। সেখান থেকে পরে চাটমোহর কেন্দ্রে দুধ আসে।
কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য ৪ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দুধ সংরক্ষণ করতে হয়। আর সে জন্যই আমরা খামারিদের কাছাকাছি পয়েন্ট করেছি। সেখানে দুধ শীতল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে।’ তিনি আরও বলেন, প্রাণ ডেইরি সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনে। এতে করে দুটি সুবিধা পাওয়া যায়। প্রথমত, মধ্যস্বত্বভোগী না থাকায় দুধের খামারিরা ন্যায্য দাম পান। দ্বিতীয়ত, ভেজালমুক্ত মানসম্মত দুধ পাওয়া যায়।
বছরের এই সময়টাতে দুধ কম পাওয়া যায়। কারণ, বন্যার কারণে জমিজমা ডুবে যায়, সবুজ ঘাসের অভাব দেখা দেয়। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় ঘাস সংরক্ষণ করা গেলে এই সমস্যায় পড়তে হয় না। এমন সব উপায় খামারিদের বাতলে দেন প্রাণের কর্মকর্তারা। বড় শালিখা গ্রামে মনজুরের বাড়ি থেকে লিলি খাতুন নামে আরেক খামারির বাড়ি যাওয়ার সময় এ কথা বলেন জাকিরুল। তিনি বলেন, গরু লালন-পালনের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শ, চিকিৎসাসেবা, পশুর খাদ্য ও ঘাসের বীজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে খামারিদের সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া প্রতি লিটার দুধে দুই টাকা বোনাস পান খামারিরা। রোজার ঈদের আগে এই বাড়তি অর্থ দেওয়া হয়।
চাটমোহর যাওয়ার আগে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বাঘা বাড়িতে প্রাণের দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুধ সংগ্রহের পাশাপাশি স্বল্পপরিসরে পনির ও দই উৎপাদন করা হচ্ছে। অবশ্য এসব দুগ্ধপণ্য কেবল উত্তরবঙ্গেই সরবরাহ করা হয়। ভবিষ্যতে প্রাণের দুগ্ধজাত সব খাদ্যদ্রব্যই এখানেই উৎপাদিত হবে।
এমন তথ্যই দিলেন প্রাণ ডেইরির প্রধান রাকিবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর জন্যই ২০০১ সাল থেকে প্রাণ গ্রুপ কাজ করে আসছে। বর্তমানে ৩১ হাজার চুক্তিভিত্তিক খামারি আছেন। তাঁরা ৭৮ হাজার গরু পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।