গ্রাহকের হাতের আঙুলের ছাপই এখন হয়ে উঠছে শক্তিশালী ও নিরাপদ পাসওয়ার্ড
গ্রাহকের হাতের আঙুলের ছাপই এখন হয়ে উঠছে শক্তিশালী ও নিরাপদ পাসওয়ার্ড

বায়োমেট্রিক কার্ডের বিপ্লব: আঙুলের ছাপেই করুন নিরাপদ লেনদেন

বাজার-সদাই শেষে পেমেন্ট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে কোনো ব্যাংক কার্ড বের করলেন। হুট করে দেখলেন, পিন নম্বরটি কিছুতেই মনে পড়ছে না। মাথার ভেতর হাজারটা সংখ্যা ঘুরপাক খাচ্ছে, অথচ প্রয়োজনীয় ডিজিটগুলো যেন উধাও! অথবা ভিড়ের মধ্যে পিন টাইপ করতে গিয়ে আড়চোখে তাকাচ্ছেন—পাছে কেউ দেখে ফেলে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই যুগে পিন বা স্বাক্ষর মনে রাখার চিরায়ত ঝক্কি এবার চিরতরে বিদায় নিতে চলেছে। গ্রাহকের হাতের আঙুলের ছাপই এখন হয়ে উঠছে শক্তিশালী ও নিরাপদ পাসওয়ার্ড। একুশ শতকের আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাংকিং খাতে যুক্ত হওয়া বায়োমেট্রিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

বিশ্বে প্রথমবারের মতো এমন প্রযুক্তির সূচনা করে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এই সেবা চালু হয়। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বায়োমেট্রিক সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের লেনদেনকে অভেদ্য নিরাপত্তায় মুড়িয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

এ বিষয়ে ইবিএলের হেড অব কার্ডস তাসনিম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পিনভিত্তিক লেনদেনের সীমাবদ্ধতা, যেমন পিন মনে রাখা, শেয়ার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং জালিয়াতির আশঙ্কা ইত্যাদি দূর করাই বায়োমেট্রিক কার্ড চালুর প্রধান অনুপ্রেরণা। আঙুলের ছাপভিত্তিক যাচাইকরণে প্রতিটি লেনদেন সরাসরি কার্ডধারীর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, ফলে নিরাপত্তা বাড়ে এবং গ্রাহকের জন্য অভিজ্ঞতাও হয় সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ।’

নিরাপত্তার নতুন দেয়াল: কেন এই কার্ড অপ্রতিদ্বন্দ্বী?

প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রচলিত পিন বা স্বাক্ষরের চেয়ে আঙুলের ছাপ কেন বেশি নিরাপদ? সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পিন নম্বর যেকোনো উপায়ে চুরি বা হ্যাক করা সম্ভব; এমনকি আপনার অগোচরে কার্ড ক্লোন করে তথ্য চুরির ঝুঁকিও থেকে যায়। কিন্তু একজনের আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণ অনন্য (ইউনিক), যা নকল করা প্রায় অসম্ভব।

বায়োমেট্রিক কার্ডের ভেতর একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম সেন্সর বসানো থাকে। কার্ডটি যখন পয়েন্ট অব সেল বা ‘পিওএস’ মেশিনে ছোঁয়ানো হয়, তখন সেন্সরটি গ্রাহকের আঙুলের ছাপ যাচাই করে মুহূর্তেই লেনদেন সম্পন্ন করে। যদি কার্ডটি হারিয়েও যায় বা চুরি হয়, তবুও চিন্তার কারণ নেই। কেননা, প্রকৃত মালিকের আঙুলের স্পর্শ ছাড়া এই কার্ড দিয়ে এক টাকাও খরচ করা সম্ভব নয়। কার্ডের তথ্যগুলো এনক্রিপ্ট করা চিপের ভেতর এমনভাবে সংরক্ষিত থাকে যে এটি ক্লোন করা বা জালিয়াতি করার ঝুঁকিকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। সহজ কথায়, আপনার কার্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন আক্ষরিক অর্থেই আপনার নিজের হাতের মুঠোয়।

নতুন এই প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ইবিএলের হেড অব কার্ডস তাসনিম হোসেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেম আগে বিদ্যমান ছিল না। ফলে বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীর কাছ থেকে সমাধান আনতে হয়েছে এবং মাস্টারকার্ডের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড পূরণ করা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে বর্তমানে গ্রাহকদের সাড়া অত্যন্ত ইতিবাচক। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির খরচ কমার সঙ্গে সঙ্গে এই বায়োমেট্রিক সুবিধা ধীরে ধীরে সাধারণ ডেবিট কার্ডসহ অন্যান্য কার্ডেও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

পিন টাইপ করার দিন কি তবে শেষ?

বায়োমেট্রিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের প্রযুক্তির আসল চমক লুকিয়ে আছে এর ব্যবহারের সারল্যে। এ ধরনের কার্ড ব্যবহারকারীকে রসিদে স্বাক্ষর করা বা কি-প্যাডে পিন টেপার প্রয়োজন নেই। কার্ডের ভেতর বিল্ট-ইন অবস্থায় থাকা সেন্সরটিই আপনার পরিচয় যাচাই করবে। ফলে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ স্তর নিশ্চিতের পাশাপাশি অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন গ্রাহকেরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তি বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। যেখানে শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই নয়; বরং গ্রাহকের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য। সাধারণ গ্রাহকদের কাছে এটি যেমন নিরাপদ, তেমনি বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁরা পিন মনে রাখতে প্রায়ই সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্যও এটি একধরনের আশীর্বাদস্বরূপ। গ্লোবাল পেমেন্ট জায়ান্টদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও এই রূপান্তর কেবল সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আঙুলের ছাপে নতুন দুনিয়া

ব্যাংকিং সেবার এই রূপান্তর জীবনকে কেবল গতিময় করতেই নয়, আরও নিখুঁত ও দুশ্চিন্তামুক্ত করতে ভূমিকা রাখছে। একসময় পিন ভুলে যাওয়া বা কার্ড ক্লোন হওয়ার যে আতঙ্ক কাজ করত, বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি সেই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। এখন আপনার সম্পদ পাহারা দিচ্ছে আপনার নিজেরই আঙুলের ছাপ। পকেটে থাকা ছোট কার্ডটিই আজ আপনার যাপিত জীবনের অন্যতম জরুরি অনুষঙ্গ।