
একটি ফ্ল্যাট কেনার আগে বেডরুম কতটি, আয়তন কত কিংবা কোন এলাকায়—কেবল এই হিসাবেই থেমে থাকছেন না এ যুগের তরুণ ক্রেতারা। ফ্ল্যাটের নকশা তাঁদের জীবনযাপনের সঙ্গে কতটা মানানসই, কাজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা যাবে কি না, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার সুবিধা কেমন কিংবা বাড়ির বাইরে নিজের জন্য আরও কিছু পরিসর আছে কি না—এসব প্রশ্নও যুক্ত হচ্ছে সিদ্ধান্তের সঙ্গে। তরুণদের জীবনযাপনের ধরন বদলানোর সঙ্গে আবাসনের চাহিদাতেও তাই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ছোট পরিবার, একা বসবাস, বাসা থেকে কাজ কিংবা ব্যক্তিগত সময়কে গুরুত্ব দেওয়া—এসব কারণে একই জায়গাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহারের সুযোগ এখন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়।
ফ্ল্যাটের আয়তনের চেয়ে জায়গার কার্যকর ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেক তরুণ ক্রেতা। একটি ঘর শুধু থাকার জন্য নয়; প্রয়োজনে সেখানে কাজ, ব্যায়াম কিংবা বিনোদনের ব্যবস্থা করা যাবে—এমন নকশাই তাঁদের কাছে আকর্ষণীয়। একইভাবে বসার ঘর, বারান্দা কিংবা অন্য কোনো অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নেওয়ার সুযোগও বিবেচনায় আসছে। অর্থাৎ জায়গা যত বড় হবে তত ভালো—এই ধারণার পাশাপাশি জায়গাটি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটিও ভাবছেন তাঁরা।
শুধু ফ্ল্যাটের ভেতরের জায়গা নয়, বাইরের পরিসরও এখন ভাবনায় থাকছে। বিশেষ করে শহুরে আবাসনে সবুজ জায়গা, হাঁটার স্থান, জিম, শিশুদের খেলার জায়গা কিংবা বসার জন্য কমন স্পেস থাকলে সেটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টিও যুক্ত। পাশাপাশি বসবাসের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হওয়া, শিশুদের একসঙ্গে খেলার সুযোগ কিংবা অবসর কাটানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে আবাসনে কমিউনিটির পরিবেশও তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে আবাসনেও। স্মার্ট লক, ভিডিও ডোরফোন, নিরাপত্তা ক্যামেরা, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল কিংবা স্মার্ট হোমের বিভিন্ন সুবিধার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইছেন ক্রেতারা।
এ ছাড়া তরুণদের আবাসন পছন্দে অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি এলাকার মূল্যায়নে শুধু স্থান নয়, সেখান থেকে অফিস, গণপরিবহন, বাজার, হাসপাতাল বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে যাতায়াত কতটা সহজ—সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে। যাতায়াতে সময় ও খরচ কমানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো হাতের কাছে পাওয়ার বিষয়টি তাঁদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কর্মজীবী তরুণদের জন্য বাসা ও কর্মস্থলের দূরত্ব, গণপরিবহনের সুবিধা এবং আশপাশের নাগরিক সুবিধাগুলো জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে আবাসন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ‘কোথায়’—এর পাশাপাশি ‘সেখান থেকে জীবনযাপন কতখানি সহজ হবে’—এই প্রশ্নটিও সামনে আসছে।
এসব বিষয়ে ছুটি গ্রুপের সিনিয়র আর্কিটেক্ট সাব্বির হোসেন সুজন বলেন, ‘বর্তমান তরুণ প্রজন্ম শুধু একটি ফ্ল্যাট বা থাকার জায়গা খুঁজছে না; তারা এমন একটি বাসস্থান চায়, যেখানে আধুনিক জীবনযাপন, স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতি—সবকিছুর সমন্বয় থাকবে।’
সাব্বির হোসেন সুজন বলেন, এখন ওপেন ও ফাংশনাল ফিচার, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, সবুজ পরিবেশ, স্মার্ট হোম সুবিধা এবং কমিউনিটি স্পেসের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। একই সঙ্গে আর্কিটেকচারে মডার্ন ও ভার্নাকুলার—দুই ধরনের উপাদানের ব্যবহারও জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্থাৎ আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও পছন্দ করছেন তরুণেরা।
সব মিলিয়ে তরুণদের আবাসন চাহিদায় বড় পরিবর্তন এসেছে জায়গা ব্যবহারের ধারণায়। বড় আয়তনের ফ্ল্যাটের পাশাপাশি এখন চাওয়া হচ্ছে পরিকল্পিত ও বহুমুখী জায়গা, যেখানে কাজ, বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনা যাবে। পাশাপাশি কমন স্পেস, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, বিনোদন ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে সিদ্ধান্তের তালিকায়।
এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে আবাসন খাতের বিভিন্ন আয়োজনেও ক্রেতাদের সামনে নানা ধরনের প্রকল্প ও সুযোগ তুলে ধরা হচ্ছে। অনলাইন আবাসন মেলার মতো আয়োজনগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প, ফ্ল্যাটের নকশা, সুযোগ-সুবিধা ও মূল্য নিয়ে সরাসরি জানার সুযোগ পাচ্ছেন সম্ভাব্য ক্রেতারা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা সহজেই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্পের অবস্থান, নকশা, কমন স্পেস, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা তুলনা করে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে আবাসন মেলা শুধু ফ্ল্যাট দেখার জায়গা নয়, বরং বদলে যাওয়া আবাসন চাহিদার সঙ্গে বাজারে কী ধরনের প্রকল্প ও সুবিধা তৈরি হচ্ছে, সেটি বোঝারও একটি সুযোগ হয়ে উঠছে।