ফ্যামিলি কার্ড
ফ্যামিলি কার্ড

বাজেট ২০২৬-২৭

ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক খাতে দেড় লাখ কোটি টাকা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কিছু নতুন কর্মসূচি যুক্ত করা হচ্ছে। আবার বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমসহ কিছু কর্মসূচিতে একদিকে উপকারভোগী বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ানো হচ্ছে ভাতার পরিমাণ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর সভাপতিত্বে গত ৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আগামী বাজেটে উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার হার চূড়ান্ত করা হয়। অর্থমন্ত্রী এ বৈঠকের কার্যবিবরণী স্বাক্ষর করেন গত ২০ মে। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বিবেচনায় রেখে আগামী বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু বরাদ্দ বৃদ্ধিতে নজর দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের আবশ্যিকভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকতে হবে। আর ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন এবং তাদের অভিভাবকদের এনআইডি থাকতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সঠিক ব্যক্তি যাতে উপকারভোগী হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন, সে জন্য ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)’ প্রয়োগ করা হবে। ডিএসআর এমন একটি তথ্যভান্ডার, যার মাধ্যমে অনলাইনে সুবিধাভোগীদের তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয় এবং তাদের উপযুক্ততা নির্ধারণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বড় সমস্যা হচ্ছে ভুল উপকারভোগী নির্বাচন, কম ভাতা, তথ্যভান্ডার ও সমন্বয়ের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচির ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়ম ইত্যাদি। প্রকৃত দরিদ্রকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে তাঁদের হাতে ভাতা পৌঁছানো নিশ্চিত করা এ খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কিছু নতুন কর্মসূচি যুক্ত করা হচ্ছে। আবার বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমসহ কিছু কর্মসূচিতে একদিকে উপকারভোগী বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ানো হচ্ছে ভাতার পরিমাণ।

ফ্যামিলি কার্ডসহ নতুন কর্মসূচি আটটি

আগামী অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো আটটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।

প্রত্যেক নারীপ্রধান পরিবার মাসে পাবেন ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। এতে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মার্চ নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। গত ২৭ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বৈঠক হয়। এতে জানানো হয়, পাঁচ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এতে ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

নতুন কর্মসূচির মধ্যে আরও আছে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী ভাতা কার্যক্রম। এতে চারটি শ্রেণি ভাগ করে মোট উপকারভোগী চিহ্নিত করা হয়েছে ১৬ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে রয়েছে শহীদ পরিবার ৮৪৪, প্রতি পরিবার মাসে পাবে ২০ হাজার টাকা। ‘এ’ শ্রেণির আহত ১ হাজার ৬০৭ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ২০ হাজার টাকা। ‘বি’ শ্রেণির আহত ১ হাজার ৬১৪ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির আহত ১২ হাজার ৪৪৮ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ১০ হাজার টাকা। এতে বছরে ব্যয় হবে ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

প্রত্যেক নারীপ্রধান পরিবার মাসে পাবেন ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। এতে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

কৃষক কার্ড কার্যক্রমে উপকারভোগী ঠিক করা হয়েছে ৪২ লাখ ৫০ হাজার। প্রত্যেক কার্ডধারীকে বছরে দেওয়া হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কার্যক্রমও নতুন একটি কর্মসূচি। মোট উপকারভোগী ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ৮৬ হাজার ৮৩৩ জন ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষ এবং একই সংখ্যক মুয়াজ্জিন, সেবাইত ও বিহার উপাধ্যক্ষ। এর বাইরে খাদেম আছেন ৮২ হাজার। ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষদের দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা করে। মুয়াজ্জিন, সেবাইত ও বিহার উপাধ্যক্ষদের দেওয়া হবে ৩ হাজার টাকা করে। আর খাদেমদের দেওয়া হবে ২ হাজার টাকা করে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের দুই ঈদে ১ হাজার করে মোট ২ হাজার টাকা উৎসব ভাতা। আর দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা ও বড়দিনে অন্যদের দেওয়া হবে ২ হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা।

‘এ’ শ্রেণির আহত ১ হাজার ৬০৭ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ২০ হাজার টাকা। ‘বি’ শ্রেণির আহত ১ হাজার ৬১৪ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির আহত ১২ হাজার ৪৪৮ জন, প্রত্যেকে মাসে পাবেন ১০ হাজার টাকা। এতে বছরে ব্যয় হবে ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

আরও থাকছে কর্মহীন শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি। এর আওতায় ১৫ হাজার শ্রমিককে মাসে ভাতা দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ৩ মাস। এ খাতে ২২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। বর্তমানে ‘রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দুস্থ শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম’ চালু রয়েছে। এর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে কর্মহীন শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি।

ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) উপকারভোগী ঠিক করা হয়েছে ১৫ লাখ। ১ লাখ ১০ হাজার টন চালের অর্থনৈতিক মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে তাঁদের। একটি সমন্বিত নীতিমালার আওতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

নতুন প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে খাল খনন কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ দুটি বাস্তবায়ন করা হবে। খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ বিভাগের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা অবশ্য ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে—দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার কারণে এগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারিত কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

ভাতার হার ও উপকারভোগী বাড়ছে

বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমে বর্তমানে ৬১ লাখ উপকারভোগীকে ৬৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। এখন ৫০ টাকা বাড়িয়ে ভাতা করা হচ্ছে ৭০০ টাকা। উপকারভোগী বেড়ে হবে ৬২ লাখ। এতে মোট ব্যয় হবে ৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

বিদ্যমান ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা কার্যক্রমের’ উপকারভোগী ১ লাখ বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হচ্ছে। তাঁদের ভাতা ৫০ টাকা বেড়ে হবে ৭০০। এতে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা।

প্রতিবন্ধী উপকারভোগী ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করা হচ্ছে। আর তাঁদের ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ হাজার টাকা। বর্তমানে মেধাবৃত্তি পান ৮১ হাজার প্রতিবন্ধী। এটা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ লাখ। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তরে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা করে যে বৃত্তি রয়েছে, তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। তাঁদের জন্য ভাতা ও বৃত্তিতে ব্যয় বাড়বে ৮৭০ কোটি টাকা।

অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকাই থাকছে। ভাতা ও বৃত্তির জন্য উপকারভোগী বাড়ছে। আবার মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচির ভাতার হার ৮৫০ টাকা রাখলেও উপকারভোগী ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০।

সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণের দরকার আছে। সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সানেম নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান

ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্থিক সহায়তা ৫০ হাজার থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে। উপকারভোগী ৬০ হাজার থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৬৫ হাজার।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানীর হার বর্তমানের মতো ২০ হাজার টাকাই থাকছে। বীর প্রতীক, বীর বিক্রম, বীর উত্তম ও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারদের সম্মানী ভাতা এখন যথাক্রমে ২০, ২৫, ৩০ ও ৩৫ হাজার টাকা। এই সম্মানী ৫ হাজার টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণের দরকার আছে। সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ২০১৫ সালে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র করা হয়েছিল। এতে উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, দ্বৈততা দূর করা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট করা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।