
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আহসান এইচ মনসুরকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) সাবেক নির্বাহী পরিচালক। অন্তর্বর্তী সরকারের গভর্নর হিসেবে অভিজ্ঞতা, ব্যাংক খাত নিয়ে নানা পদক্ষেপ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ নানা প্রসঙ্গে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার আপনার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করেছিল?
আহসান এইচ মনসুর: ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আমাকে ফোন করে বলেন, তোমার কাছে একটি প্রস্তাব আসবে; আগেরবারের মতো তুমি ‘না’ বলতে পারবে না।
আগেরবারের মতো মানে?
আহসান মনসুর: শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও আমাকে একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমি রাজি হইনি। কারণ, আমি মনে করেছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নেই।
সেটা কোন সময়ে?
আহসান মনসুর: ফজলে কবিরের দ্বিতীয় মেয়াদের আগে। আমি রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে ফজলে কবিরের জন্য বয়সসীমা বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার যে আপনাকে গভর্নর করল, সরকারের পক্ষ থেকে কি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা বা শর্ত আপনাকে জানানো হয়েছিল?
আহসান মনসুর: না, দায়িত্ব নেওয়ার আগে কোনো আলোচনা হয়নি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আমার পরিচিতিমূলক প্রথম বৈঠকটি হয়, দেশের অর্থনীতি নিয়ে মতবিনিময় হয়; তবে তিনি কোনো নির্দেশনা দেননি। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমি স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাই। আশা করি সেই সুযোগ পাব।
আপনি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতকে কী অবস্থায় পেয়েছিলেন?
আহসান মনসুর: বাইরে থেকে পরিস্থিতি যতটা খারাপ মনে করেছিলাম, বাস্তবে অবস্থা ছিল তার চেয়েও খারাপ। আমি আগে থেকেই সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক তথ্য, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতাম। আমার ধারণা ছিল, ঘোষিত খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ সরকারি হিসাবের অন্তত আড়াই গুণ। আমি প্রকাশ্যেই বলেছি, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেল পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। খেলাপি ঋণ শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল বিদেশি পরিশোধের বকেয়া। ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণপত্র (এলসি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ হয়নি। বিদ্যুৎ খাতের বিলও বকেয়া ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণসুবিধা বা লাইন অব ক্রেডিট কমিয়ে দিতে শুরু করেছিল। কেউ ১০ কোটি ডলারের সীমা ৫ কোটিতে নামিয়ে আনছিল। কেউ তা আরও কমিয়ে দিচ্ছিল। কেউ কেউ এমন হুমকিও দিচ্ছিল যে বাংলাদেশের সঙ্গে আর ব্যবসাই করবে না।
তখন আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আহসান মনসুর: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। কয়েক বছর ধরে অর্থনীতি নিম্নমুখী ছিল। বিনিময় হার দ্রুত বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, রিজার্ভ কমেছে। আমি বিশ্বাস করতাম, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করা না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল বিনিময় হার স্থিতিশীল করা। কারণ, বিনিময় হার ৮২ টাকা থেকে ১২০ টাকা হয়ে গেল। কীভাবে এটাকে স্থিতিশীল করা যায়, সেটা ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ।
আপনি কি সরকারকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?
আহসান মনসুর: না, সরকার আমার কাছে প্রতিশ্রুতি চায়নি, আমিও দিইনি। তবে আমার নিজেরই প্রতিশ্রুতি ছিল, হচ্ছে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আর কমতে না দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাও ছিল আমার প্রতিশ্রুতি।
আর কিছু নয়?
আহসান মনসুর: আরও ছিল ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এর অংশ হিসেবেই দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন শুরু করি; ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়। নতুন পরিচালনা পর্ষদকে ব্যাংকগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়; তাদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা হয়। নীতিগত দিকেও দ্রুত কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নীতিসুদ (পলিসি রেট)। ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯, ৯ থেকে ৯ দশমিক ৫, ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশে গিয়ে আমি থেমেছি। এর উদ্দেশ্য ছিল মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা।
কী কী পারেননি?
আহসান মনসুর: আমার লক্ষ্য ছিল এ বছরের জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা। এই সময়ে তো আমি ছিলাম না। থাকলেও হয়তো নামত না। আমি থাকা পর্যন্ত এটা ৮ শতাংশের ঘরে ছিল। এখানে সামান্য ব্যর্থতা আছে। তবে বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে পেরেছি। বিনিময় হার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আমাকে প্রচণ্ড বিতর্ক করতে হয়েছে। ওরা চাচ্ছিল অন্য সব শর্ত পূরণ করা হলে তারা কিস্তি ছাড় করবে। পাশাপাশি বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করে দিতে হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। আমি নীতিগতভাবে বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের বিরোধী ছিলাম না। কিন্তু বলেছিলাম, সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এটা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের কথা। অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠক ওয়াশিংটনে, তার আগেই বিতর্ক। আমি আশঙ্কা করেছিলাম, এতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। বললাম, বাজারে যখন আতঙ্ক, বিপুল বকেয়া দায় এবং এ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে, বিনিময় হার তখন বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এমনকি শ্রীলঙ্কার মতো ৩০০ থেকে ৩৫০ রুপি পর্যন্ত হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা আছে। শ্রীলঙ্কায় তো এখনো প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাওয়া যায় ৩৩৬ রুপি। পাকিস্তানের যুক্তিও দেখালাম। পাকিস্তানে এখনো প্রতি ডলারের বিপরীতে মেলে ২৮৫ রুপি। এটা কি আমরা চাই? আইএমএফকে বলেছিলাম, অন্তত আমি এটা চাই না।
বাংলাদেশ ব্যাংকে এসে আপনি কি বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা, দুর্বলতা ও দুর্নীতি দেখেছিলেন, যা আপনাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছিল?
আহসান মনসুর: সত্যি কথা বলতে, বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া উচিত, তা তাঁদের দেওয়া হয় না। এর বেতনকাঠামো বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের বেতনকাঠামোর মতো। এটা ভারতেও নেই। সেখানে রিজার্ভ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি। পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই একই ব্যবস্থা। দক্ষ লোক আনতে হলে ভালো বেতন দিতে হবে। তাঁদের দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হলেও একটি প্রতিযোগিতামূলক বেতনকাঠামো প্রয়োজন।
আমাদের এখানে সেই ব্যবস্থা নেই। ফলে খুব মেধাবীরা অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে আসতে চান না। আর দুর্নীতি নেই, এ কথা বলতে পারব না। তবে আমি এটাও বলব, বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক ভালো কর্মকর্তাও আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গেলে ভালো বেতনকাঠামোতে নিয়ে আসা যেত।
গভর্নর হিসেবে নেওয়া কোন কোন সংস্কার পদক্ষেপকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
আহসান মনসুর: একক বড় কিছু তো আর এটুকু সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। আমরা কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছি। যেমন নতুন আমানত বিমা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা করেছি। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করতে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, পরে আইন হয়েছে। এ আইনের অধীনে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক কিছুই করতে পারবে। পাঁচ ইসলামি ব্যাংক ইতিমধ্যে একীভূত হয়েছে। ১৮ক ধারা যুক্ত করে আইনে পুরোনো মালিকদের এই ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার তা বাতিল করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণা স্বাভাবিক। ব্যাংক কোম্পানি আইনের অধ্যাদেশও করা হয়, যা এখনো আইন হয়নি। এতে উদ্যোক্তা শেয়ারধারীদের ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। অর্থঋণ আদালত অধ্যাদেশের খসড়াও সরকারের কাছে জমা দেওয়া আছে। এটার খুব দরকার। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের (ডামা) খসড়াও তৈরি করে দিয়েছি।
ডামার খসড়া তো মাত্র ওয়েবসাইটে দিল। অন্য দেশে ডামা পদ্ধতি কেমন কার্যকর?
আহসান মনসুর: তা দিতে পারে। তবে আমরাই এটা তৈরি করে দিয়েছিলাম। আমলাতন্ত্রে তো অনেক কিছুই দেরি হয়। তখনকার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এটা করতে রাজি ছিলেন, তবে দেরিতে। অর্থঋণ আদালত এবং ডামা—এ দুটো হয়ে গেলে খেলাপি সমস্যার বড় ধরনের সমাধান আসবে। ডামার মাধ্যমে আমরা চেয়েছিলাম সম্পদগুলো রক্ষা পাক, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করুক। বেসিক ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক, যুবক, ডেসটিনি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা কিছুই ফেরত পায়নি। ১০ টাকা হলেও পাওয়া উচিত। ডামা থাকলে ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত কোনটা ছিল? পেছনে ফিরে তাকালে এমন কোনো সিদ্ধান্ত কি আছে, যা এখন ভিন্নভাবে নিতেন?
আহসান মনসুর: কঠিন সিদ্ধান্ত তো অনেক ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত। আমরা খুব সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা করেছি। আমাদের মূল্যায়ন ছিল, এর চেয়ে ভালো কোনো সমাধান নেই। তবে এতে অবশ্যই ঝুঁকি আছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—সরকার এটা কীভাবে পরিচালনা করবে, সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না।
খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? বর্তমান পরিসংখ্যান কী বাস্তবতা তুলে ধরে?
আহসান মনসুর: আমরা যতটুকু পেরেছি, প্রকৃত অবস্থাই তুলে ধরেছি। সামান্য এদিক-ওদিক হতে পারে, কিন্তু খুব বড় কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। এখন সরকারের দায়িত্ব হবে, কীভাবে এই প্রায় ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ ধীরে ধীরে ৩-৪ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়। এটি এক-দুই বছরে সম্ভব নয়। অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। এ জন্য আমানত বাড়াতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা কি সম্ভব?
আহসান মনসুর: অবশ্যই সম্ভব। সবকিছু নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। আমরা প্রায় দেড় বছর কাজ করেছি। এই সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আমাকে কখনো ফোন করে বলা হয়নি, অমুককে চেয়ারম্যান করতে হবে বা অমুককে নিয়োগ দিতে হবে। সব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকই নিয়েছে। আমাদের ভুলও হয়েছে। যেমন ইসলামী ব্যাংকে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে দেখা গেছে, তিনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আমরা তাঁকে সরিয়ে দিই। প্রথম দিনই তো তাঁকে চিনতাম না। সিভি ভালো ছিল। যাঁরা নাম প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁদের সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে তথ্য পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। ভুল হলে তা সংশোধন করতেই হবে।
আগের সময়ের লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির কতটা অগ্রগতি হয়েছিল?
আহসান মনসুর: আমরা এ বিষয়ে অনেক উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সরকারের মাধ্যমে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। আমরা প্রতি দুই-তিন মাস পরপর সেই টাস্কফোর্সের অগ্রগতি উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপন করতাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, দেশে ও বিদেশে যেসব সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করা।
আমরা দুইভাবে কার্যক্রম চালিয়েছি। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ১২টি যৌথ তদন্ত দল (জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম বা জেআইটি) গঠন করা হয়। তাদের জন্য ১২টি অফিস, আসবাব, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—সবকিছু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই করে দেওয়া হয়। প্রতিটি জেআইটিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একটি পরিবারভিত্তিক মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা সব নথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে, তারপর সেগুলো আদালতে অথবা বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে—এভাবে পুরো কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। এ কাজে বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ব্রিটিশ সরকার আমাদের সহায়তা করেছে।
কার্যক্রমটি এখন কি চলছে?
আহসান মনসুর: আমি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত চলছিল। একজন ব্রিটিশ পরামর্শককে এক বছরের জন্য ঢাকায় রাখা হয়। তিনি হাতে-কলমে শিখিয়েছেন কীভাবে তদন্ত করতে হয়, কীভাবে নথি প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় এবং কীভাবে গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয়। কারণ, নথি ফাঁস হয়ে গেলে বিদেশের আদালতে সেটি গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। তাই এসব বিষয়ে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আমরা ১৩টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে এনে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি করিয়েছি, যাতে তারা বিদেশে দেওয়ানি মামলা করতে পারে। সেই প্রক্রিয়াও চলছিল। আমরা পথনকশার অনেক কাজ করে দিয়েছি। সরকারের দায়িত্ব হবে এগুলো সামনে এগিয়ে নেওয়া। বিদেশে যেসব মামলা হবে, সেগুলো চালিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় রাখতে হবে। ব্যাংকগুলোকে চাপ দিতে হবে, যাতে তারা এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদেশে মামলাগুলো পরিচালনা করে।
আমরা এমনভাবে ব্যবস্থা করেছি যে তারা যদি সফলভাবে টাকা উদ্ধার করতে পারে, তাহলে ১৫ বা ২০ শতাংশ তারা রাখবে, আর বাকি ৮০ বা ৮৫ শতাংশ আমাদের দিয়ে দেবে। আমাদের কোনো খরচ হবে না। তারা আমাদের দেওয়া প্রমাণ নিয়ে আদালতে যাবে। যদি ১০০ টাকা উদ্ধার করতে পারে, তাহলে ১৫ টাকা রেখে বাকি টাকা ব্যাংকগুলোকে ফিরিয়ে দেবে।
পলিসি রেট বা উচ্চ সুদের হার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে নীতি ছিল, তা কমানো উচিত হবে কবে?
আহসান মনসুর: আমি যখন পলিসি রেট ১০ শতাংশে নিয়েছিলাম, তখন আপনাদের মাধ্যমেই বলেছিলাম যে মূল্যস্ফীতি ও পলিসি রেটের ব্যবধান যখন ২ শতাংশের বেশি হবে, তখন আমরা পলিসি রেট সমন্বয় করা শুরু করব। আমরা দুই থেকে আড়াই শতাংশের কাছাকাছি গিয়েছিলাম, কিন্তু পুরোপুরি হয়নি। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ব্যবধান দেড় শতাংশের কিছু বেশি হয়েছিল। যদি মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসত, তাহলে আমরা অবশ্যই পলিসি রেট কমাতাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল পলিসি রেট ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে প্রায় ২ শতাংশের ব্যবধান রাখা। এটিই ছিল আমাদের গাইডিং প্রিন্সিপল। মূল্যস্ফীতি কোনো সময় ৫ শতাংশে নেমে এলে পলিসি রেট ৭ শতাংশে নামানো যেতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আগে মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে।
আমার ওপর চাপও ছিল। তখনকার সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, পলিসি রেটের বিষয়ে কিছু করা যায় কি না। আমার জবাব ছিল, ‘না’; কারণ, ২ শতাংশের ব্যবধান না হওয়া পর্যন্ত আমি স্বস্তিবোধ করব না।
রিজার্ভ, ডলার বাজার বা বিনিময় হার নিয়ে এখন মানুষের কি আর কোনো দুশ্চিন্তার কারণ আছে?
আহসান মনসুর: দেখুন, এগুলোকে কখনোই নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতি সব সময়ই একটি চ্যালেঞ্জ। কেউ যদি মনে করেন, বিনিময় হার একবার স্থিতিশীল হয়ে গেছে, এখন আর নড়বে না—তাহলে সেটা সবচেয়ে বড় ভুল হবে। বিনিময় হার এখনো কিছুটা চাপের মধ্যে আছে। সে কারণেই শুনছি বাংলাদেশ ব্যাংক আবার সেটি স্থির করে রেখেছে। আমার মতে সেটা কাম্য নয়।
বিনিময় হারকে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় হতে দিতে হবে। তবে সেটা ধীরে ধীরে মসৃণভাবে হওয়া উচিত। আমরা ডলারের বিনিময় হার ১২০ থেকে ১২২ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল করেছিলাম। তখন ভারতের ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮২ রুপি। আমার শেষ সময়ে ভারতে তা ৯৮ রুপিতে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ তারা ধীরে ধীরে সমন্বয় করেছে। আমাদের ভাবতে হবে প্রতিবেশীরা কী করছে, প্রতিযোগীরা কী করছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাধা কোথায়?
আহসান মনসুর: ঠিক বাধা নয়, বলতে পারেন চ্যালেঞ্জ। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছিলাম। বিদেশিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ হচ্ছিল। আমি সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলাম। সরকারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সহযোগিতাপূর্ণ ছিল। মোট কথা, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এটা এক-দুই বছরের মামলা নয়। রিজার্ভ চুরির মামলা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি না? বিদেশে গিয়ে মামলায় যেতে হবে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আর্থিক খাত সংস্কারের যেসব সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কতটা কাজে লাগানো গেছে?
আহসান মনসুর: আমরা তো পথনকশা দিয়েই এসেছি, সেগুলো করলেই অনেকটা হয়ে যাবে। তবে নতুন সংকট যেন সৃষ্টি না হয়, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যা করা হয়েছিল। এতে সবারই ক্ষতি হয়েছে। এস আলমের আসা হবে না আশা করি। জনগণ এস আলমকে আসতে দেবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কি স্বাধীনতা আছে? আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? আপনি কি কোনো চাপ অনুভব করেছিলেন?
আহসান মনসুর: না, তবে পলিসি রেট নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমানো উচিত। আমার অবস্থান ছিল, এখন কমানো ঠিক হবে না। আরও কয়েক মাস দেখতে হবে। পরে তাঁরা আমার যুক্তি মেনে নেন।
আপনি গভর্নরের জন্য মন্ত্রীর সমমর্যাদা চেয়েছিলেন কেন?
আহসান মনসুর: বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এটা আছে।
না, অনেক দেশেই নেই।
আহসান মনসুর: সব দেশেই আছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। তবে এটা আমার জন্য চাইনি, চেয়েছিলাম চেয়ারটার জন্য। আমি এখনো মনে করি, গভর্নরের অবস্থান মন্ত্রীদেরও ওপরে হওয়া উচিত।
এতে কী লাভ হবে?
আহসান মনসুর: আপনি কতজন মন্ত্রীকে চেনেন? বাংলাদেশে তো ১ হাজার জন মন্ত্রী হয়েছেন ৫৫ বছরে। গভর্নর হয়েছেন কতজন? ১৪ জন। হাতে গুনতে পারবেন এবং নাম বলতে পারবেন। তাহলে কার অবস্থান ভালো? প্রটোকল দিয়ে কী হবে? বিষয়টা হচ্ছে গভর্নরকে তাঁর মর্যাদা দিতে হবে এবং গভর্নরের স্বাধীন থাকা উচিত।
গভর্নর পদটা তো নিজেই মর্যাদাপূর্ণ, আবার কিসের মর্যাদা?
আহসান মনসুর: আমাদের রুলস অব বিজনেসে তাঁকে সচিব পর্যায়ে নামিয়ে দেওয়া হয়, যা একদম গ্রহণযোগ্য নয়। চেয়ার যখন বসায়, তাঁকে পেছনে বসতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেন মন্ত্রিসভায় গভর্নরকে পেছনের সারিতে বসতে হবে? অন্য গভর্নররাও এ কথা বলেছেন। এটা লজ্জাজনক। তাঁরা মুখ ফুটে বলেননি, আমি বলেছি। আমি সালেহউদ্দিন আহমেদকে বলেছিলাম, এটা আমার পর থেকে দিন, তবু দিন।
এই সময়ের অর্থনীতির বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ কী?
আহসান মনসুর: প্রথমত, রাজনীতি ও অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমি যদি রাজনীতি ঠিক করতে না পারি, তাহলে অর্থনীতি ঠিক হবে না। জুলাইয়ের অঙ্গীকার তো যাবে না। এটা আছে, থাকবে। সে অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাইয়ের প্রত্যাশা কী? সংসদ দ্বিকক্ষ হবে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, সরকারের দুই মেয়াদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এগুলো তো আমাদের দরকার, এগুলো না হলে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হবে। ইতিমধ্যে হচ্ছে এবং এটা আরও দানা বাঁধবে। তার আগেই এটি সমাধান করে ফেললে সরকারের ও দেশের ভালো হবে। আমরা চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে এগিয়ে যাক। গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাব আসবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যা করার দরকার, তা করতে হবে। আইনগুলোর বাস্তবায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উঠিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সরকারের ছিল, তা করা উচিত।
আপনাদের সময়ে তো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উঠিয়ে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
আহসান মনসুর: এটা সালেহউদ্দিন আহমেদের ব্যর্থতা। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বহুবার বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এটা করবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও সম্ভবত এটা আছে। দ্বৈত শাসন আর্থিক খাতের জন্য খারাপ। বিশ্বের সব দেশে একটা প্রতিষ্ঠানই ব্যাংক খাত পরিচালনা করে। আমাদের এখানে দ্বৈত শাসন চলছে। এটা বন্ধ করতে হবে। আর বিশ্বের সব দেশেই রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি মালিকানাধীন—উভয় ধরনের ব্যাংকের জন্য একই আইন থাকে।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ কোনটি?
আহসান মনসুর: রাজস্ব ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। এখানে ভয়ানক দুর্বলতা আছে। কাজটি কঠিন। রাজস্ব ভালোমতো আহরণ করা গেলে ১৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট করা যেত। রাজস্ব আসছে না, কিন্তু ব্যয় বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না। প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে আলোচনা নেই। বেতন বাড়ানো হচ্ছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি, বিনিময়ে দেশবাসী কী পাবে, তা নিয়ে কথা নেই। মানুষ কীভাবে ভালো সেবা পাবে, তা নিয়ে কথা নেই। সরকারের আকার কমাতে হবে। এত মন্ত্রণালয়ের দরকার নেই। শত শত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকার ব্যাংক খাত যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, দুই বছরে তার কতটা পরিবর্তন হলো?
আহসান মনসুর: দুই বছরের মধ্যে আমরা ছিলাম দেড় বছরের মতো। ডায়াগনোসিস করতেই সময়টা লেগে গেছে। সাত-আটটা আইন তৈরিতে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে। সমাধানগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। এখন দরকার বাস্তবায়ন। করতে পারলে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
আপনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের একশ্রেণির কর্মকর্তা আন্দোলন করছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, চেয়েছিলাম স্বায়ত্তশাসন, পেয়েছি স্বৈরশাসন। আপনার কোনো সিদ্ধান্ত বা নেতৃত্বের ধরন কি এর জন্য দায়ী ছিল?
আহসান মনসুর: সরকার পরিবর্তনের সুযোগে এটা ঘটিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তাঁদের প্রায় সবাই বিগত সরকারের অনুসারী। এখনো। সেই চক্র আমি ভাঙিনি, তবে কিছু সংস্কার করতে চেয়েছিলাম। এখানে অনেক অপ্রয়োজনীয় পদোন্নতি হয়েছে। ওপরের দিকে অনেক পদ বাড়ানো হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক ১৪ জন, অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪৩ জন। ভারতের ব্যাংক খাত আমাদের চেয়ে ১০ গুণের বেশি বড়। পদোন্নতি দিয়ে দিয়ে যে কাউকে নির্বাহী পরিচালক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ এটা খুবই উচ্চ পদ, সচিব পর্যায়ের। এখানে ৯৯ শতাংশ স্টাফের মূল্যায়ন ‘আউটস্ট্যান্ডিং’। সবাই আউটস্ট্যান্ডিং, কিন্তু কাজ করি বা না করি, কোনো জবাবদিহি নেই। মানে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেই সমস্যা আছে।
বর্তমান সরকারের সামনে কী ঝুঁকি দেখছেন?
আহসান মনসুর: বর্তমান সরকারের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাচ্ছে। আগামী সরকারের পিঠও দেয়ালে ঠেকে যাবে। কারণ, সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। স্বাধীনভাবে ব্যয় করার সক্ষমতা কমে আসছে। তারপরও আমি থাকতে একটি টাকাও ছাপিয়ে সরকারকে দিইনি। যেটা ছাপিয়েছি, সেটা ব্যাংক খাতকে ধসে পড়া থেকে রক্ষা করতে তারল্য সংগ্রহের জন্য। ওই সময়ে এর কোনো বিকল্প ছিল না। না করলে হয়তো ১৫টা ব্যাংক সমস্যায় পড়ত।
বাংলাদেশের সামনে কি কোনো সম্ভাবনা দেখতে পান?
আহসান মনসুর: সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে সেটা অর্জন করার জন্য ভালো ভিশন ও মিশন নিয়ে কাজ করা দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকেও আমরা আশা করেছিলাম, তারা বড় কিছু করবে, দেশকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে। তারা তো সেটা করেইনি, বরং উল্টো দিকে গেছে। বর্তমান সরকারের কাছ থেকেও আমরা প্রত্যাশা করছি। তারা যেন আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সত্যিকারের অর্থেই ভালো সংস্কার করে। তারা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করুক, যাতে পাঁচ বছর পরে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোট দিয়ে আবার ফিরিয়ে আনতে চায়। আমরা তো সরকারের ব্যর্থতা চাই না, সাফল্য চাই। সমালোচনা করি, কারণ সরকারের ব্যর্থতা আমাদের পীড়া দেয়।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় টেলিভিশনের খবরে আমরা জানতে পেলাম, আপনি আর গভর্নর নন। সেই মুহূর্তে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? আপনি কি সরকারের কাছ থেকে আগেই কোনো ইঙ্গিত পেয়েছিলেন?
আহসান মনসুর: না, কোনো ইঙ্গিত ছিল না। আমি তো দুই দিন আগেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা আলাপ করে এলাম। আসার সময় বললাম, আপনি বাজেটটা সামলান, আর আর্থিক খাত আমার ওপর ছেড়ে দেন। উনি তো বলতে পারতেন যে শীর্ষ পর্যায় থেকে সমস্যা আছে।
এমনও তো হতে পারে যে উনি শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না।
আহসান মনসুর: তা আমি জানি না। আমি নেতিবাচকভাবে কিছু বলতে চাই না। তবে যা হয়েছে, তাতে ব্যক্তিগতভাবে আমার কিছু আসে যায়নি। এটুকু সময়ে আমি অনেক কিছু করতে পেরেছি। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করেছি। রিজার্ভ ২০ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে এসেছি। বিনিময় হারকেও স্থিতিশীল করেছি। মূল্যস্ফীতি বহুলাংশে কমিয়ে এনেছি। ব্যাংক খাতের যে সংস্কার কার্যক্রম আমরা রেখে এসেছি, তা যদি সরকার বাস্তবায়ন করে, তাহলে আগামী পাঁচ-সাত বছরে জনপ্রিয়তা পাবে।