বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ–সংকট কাটেনি। এ কারণে খুচরা দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল চাহিদা অনুসারে পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে কোথাও কোথাও দামও বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। অনেকটা ‘রেশনিংয়ের’ মতো (সীমিত পরিমাণে) করে ডিলারের কাছ থেকে তাঁদের সয়াবিন তেল কিনে আনতে হচ্ছে। আর পরিবেশক পর্যায়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে খুচরাতেও কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে তা বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) সীমার মধ্যেই আছে। যদিও কোথাও কোথাও এমআরপির চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের এই সরবরাহ–সংকট প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে। মূলত তেল কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে ছাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে জানিয়ে দেশেও দাম সমন্বয়ের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, এ বাজারের প্রায় সব কটি মুদিদোকানে হাতে গোনা কয়েক বোতল করে পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল রয়েছে। তবে এক ও দুই লিটারের তেলের বোতল অনেক দোকানে পাওয়া যায়নি। পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের বাইরে অন্যান্য ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে।
কৃষি মার্কেটের মুদি দোকান খোকন জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশকেরা আমাদের রেশনের মতো করে তেল (সয়াবিন) দিচ্ছে। আগে তারা দোকানে এসে দিয়ে যেত। এখন আমরা গিয়ে বারবার বলেও চাহিদামতো তেল পাচ্ছি না।’
দেশে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ছয় টাকা দাম বাড়ানো হয়। তাতে এক লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) দাঁড়ায় ১৯৫ টাকা, দুই লিটার ৩৯০ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতলের খুচরা মূল্য ঠিক হয় ৯৫৫ টাকা। এরপর কোম্পানিগুলো আর দাম বাড়ায়নি। সাধারণত পরিবেশক বা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা তেল কেনেন। গত দেড় মাসে পরিবেশক পর্যায়ে তেলের দাম বেড়েছে। ফলে কিছুটা খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৯৫৫ টাকা। দোকানদারেরা এই তেল ৯৪৫ টাকায় পরিবেশকের কাছ থেকে কেনেন এবং ৯৫০-৯৫৫ টাকায় ভোক্তার কাছে বিক্রি করেন। মাস দেড়েক আগে খুচরা দোকানিরা পরিবেশকের কাছ থেকে পাঁচ লিটারের বোতল ৯৩৫ টাকায় কিনে ভোক্তার কাছে ৯৪০-৯৪৫ টাকায় বিক্রি করতেন। এখন ভোক্তা পর্যায়ে সয়াবিনের দাম ১০ টাকা করে বেড়েছে। যদিও এ দাম এমআরপির সীমার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু ভোক্তাকে আগের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
এদিকে ঢাকার কোথাও কোথাও এমআরপির চেয়ে বেশি দামেও বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকার একটি দোকান থেকে গত বৃহস্পতিবার ৪০০ টাকায় দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কেনেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সানাউল্লাহ। যদিও বোতলের গায়ে এমআরপি লেখা ছিল ৩৯০ টাকা। এক লিটার ও পাঁচ লিটারের বোতলেও অনেক স্থানে এভাবে বেশি দাম রাখা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক জায়গায় পাঁচ লিটারের বোতল ৯৭৫-৯৮০ এবং এক লিটারের বোতল ২০০-২১০ টাকা দরেও বিক্রি হচ্ছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ–সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেল কেজি আকারে বিক্রি হয়। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে অন্তত পাঁচ টাকা বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল গতকাল বিক্রি হয়েছে ১৯৮-২০০ টাকায়। আর প্রতি কেজি খোলা পাম তেল বিক্রি হয় ১৭০ টাকায়।
দেশের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বাজারে তেলের সরবরাহ–সংকটের নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ভোজ্যতেল কোম্পানির কর্মকর্তা জানান, চার-পাঁচ মাস ধরে দেশে সয়াবিনের দাম সমন্বয় হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে এবং লোকসান দিয়ে তাঁরা তেল বিক্রি করছেন। দ্বিতীয়ত, দেশে বর্তমানে হাতে গোনা চার-পাঁচটি কোম্পানি ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বিক্রি করছে। এটি চাহিদার তুলনায় কম। এ ছাড়া বর্তমান জ্বালানি–সংকটের কারণে কারখানা থেকে তেল সরবরাহকারী ট্রাক আসার পরিমাণ কমে গেছে। এ কারণে সরবরাহে প্রভাব পড়েছে।
এদিকে নতুন সরকারের কাছে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল ওয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত ২৫ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি।