
২০১০ সালে গ্রামের ৩৬ শতাংশ পরিবার ঋণ গ্রহণ করত, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এসব ঋণের ২৫ শতাংশই তখন ছিল কৃষির জন্য। অথচ এখন কৃষির হিস্যা কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ এক যুগে কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ। গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে এমনটা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে গ্রামে নতুন ব্যবসা, বাড়িঘর তৈরি ও ভোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়নের সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। ‘ফিন্যান্সিং ফুড সিস্টেমস ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স অ্যান্ড পলিসি ডায়ালগ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই)।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিসচিব মো. সেলিম খান। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বিশেষ অতিথি এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে সংলাপে গ্রামীণ ঋণবাজারের পরিবর্তন, প্রাণিসম্পদ খাতে অর্থায়ন, শহুরে খাদ্য বিক্রেতাদের জন্য আর্থিক পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক কাজী ইকবাল। এতে তিনি জানান, গ্রাম এলাকায় প্রতি চারটি ঋণের তিনটি নেওয়া হয় বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে। ২০১০ সালে গ্রামে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিত। ২০২২ সালে তা কমে হয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে পরিবারগুলোর ঋণ নেওয়া কমেছে।
কৃষিঋণ কোন কোন কাজে ব্যয় করা হয়, সেটিও উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১০ সালে সারের পেছনে ব্যয় হতো ঋণের ৪৪ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে হয় ৫৬ শতাংশ।
আবার এখন ঋণ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। ৪১ শতাংশ ঋণ গ্রহণকারী পরিবার তাদের মাসিক আয়ের ৪০ শতাংশ কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করে। ২০১০ সালে এমন ঋণগ্রহীতার হার ছিল ২২ শতাংশ। এ ছাড়া ৩৩ শতাংশ পরিবারের দুটি বা এর বেশি ঋণ রয়েছে।
কৃষকের কাছে ৯০ শতাংশ ঋণই যাচ্ছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু এসব ঋণের সুদ অনেক বেশি। তাই কৃষকদের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। আবার কৃষি উপকরণের দামও বেড়েছে। ফলে কৃষকের মুনাফা কমেছে।মো. ফজলুল কাদের, এমডি, পিকেএসএফ
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্যাংকঋণ কম
অনুষ্ঠানে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়ন নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন আইএফপিআরআইয়ের প্রতিনিধি মেহরাব বখতিয়ার। তিনি জানান, কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ১ লাখ থেকে ৩২ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। তবে এসব যন্ত্র দিয়ে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। গ্রামে অন্য কোনো ব্যবসায়ে যন্ত্র ভাড়া দিয়ে এত বেশি আয় হয় না। তবু ব্যাংকগুলো যন্ত্র কেনার জন্য মাত্র ২ থেকে ৭ শতাংশ অর্থায়ন করে। দেশে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার যন্ত্র বিক্রি হয়।
মেহরাব বখতিয়ার জানান, কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ না পেয়ে ক্রেতারা বাধ্য হয়ে অন্য উৎস থেকে ঋণ নেন। এর মধ্যে ৩২ শতাংশ আত্মীয়দের, ২৭ শতাংশ এনজিও প্রতিষ্ঠান এবং ৮ শতাংশ মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিসচিব মো. সেলিম খান বলেন, কৃষককে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে কৃষকদের।
এ বছর পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি জানিয়ে কৃষিসচিব বলেন, দুই বছরের মধ্যে মরিচ ও টমেটো আমদানির প্রয়োজন হবে না।
অনুষ্ঠানে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল কাদের বলেন, কৃষকের কাছে ৯০ শতাংশ ঋণই যাচ্ছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু এসব ঋণের সুদ অনেক বেশি। তাই কৃষকদের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। আবার কৃষি উপকরণের দামও বেড়েছে। ফলে কৃষকের মুনাফা কমেছে। তাই কৃষকের সন্তান এখন কৃষিতে আসতে চায় না।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, এসব গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে। একদিকে যেমন কৃষি পরিবার বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষেত্র পরিবর্তন করে নতুনভাবে ফিরে আসছে তারা। তবে উৎপাদনশীলতা না বাড়াতে পারলে কৃষি খাতকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এরশাদুল হক বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ একটি লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র। এখানে ব্যাংকগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। ব্যাংক হয়তো যন্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিচ্ছে। তারা আবার কৃষককে বাকিতে যন্ত্র দিচ্ছে। তাই কৃষকের ওপর দ্বিগুণ সুদের ভার পড়ছে। সভায় সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।