
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) গঠনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে। এই ব্যাংকের উদ্যোক্তা চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গতকাল সোমবার বাংলাদেশসহ ৫০টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে চুক্তিতে সই করেছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে।
এআইআইবির সদস্য দেশগুলোর বিশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় চুক্তিটি সই হয়। এআইআইবির মহাসচিব জিন লিকুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব মতিউর রহমান। ইআরডি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
১০ হাজার কোটি ডলারের অনুমোদিত মূলধন নিয়ে চীনের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে এআইআইবি গঠিত হয় ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংযোগ স্থাপনে ঋণ ও অর্থ সহায়তা দেওয়াই এ সংস্থা গঠনের উদ্দেশ্য। চীনের পাশাপাশি ভারত, রাশিয়া, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়াও এটির অন্যতম শেয়ারহোল্ডার।
এআইআইবি গঠনের উদ্যোগকে সহজভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। আবার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এআইআইবি গঠিত হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান গতকালের মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় যোগ দেয়নি। এর আগেও এআইআইবিতে যোগ না দিতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে সদস্য হওয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার আবেদন বাতিল করেছে এআইআইবি।
বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ থাকার পরও কেন এআইআইবি হচ্ছে—তা নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন এখন বড় অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের চেয়েও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফে চীনের প্রভাব খুবই নগণ্য। যেমন: এডিবিতে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের শেয়ার তিন গুণ বেশি। আবার আইএমএফে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার পাঁচ গুণ বেশি।
যোগাযোগ করা হলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। সে হিসেবে এআইআইবির আগমন বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক হবে।’
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক এআইআইবির প্রতিযোগী সংস্থা হবে না। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক যেমন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে, আশা করছি এআইআইবিও তা-ই হবে।’
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। এতে বাংলাদেশের জন্য ছয়টি খাত চিহ্নিত করে সংস্থাটি বলেছে, আগামী ১০ বছরের প্রত্যেক বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের দরকার পড়বে ৭০০ কোটি থেকে এক হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ ১০ বছরে মোট দরকার পড়বে ৭ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি ডলার (১ ডলার ৭৮ টাকা হিসাবে ১০ হাজার ডলারে হয় ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)।
এআইআইবির সদস্য হতে এর আগে গত অক্টোবরে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশসহ ২৪টি দেশ।
৫৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ৫০টি কেন গতকাল আর্টিকেলস অব এগ্রিমেন্টে বা চুক্তিতে সই করল—জানতে চাইলে ঢাকায় ইআরডির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি উন্মুক্ত থাকবে। বাকিরা চাইলে এ বছরের যেকোনো সময় সই করতে পারবে।’
জানা গেছে, এআইআইবির ৩০টি সদস্য দেশের মধ্যেই রয়েছে মোট মূলধনের ৯৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ এখনো বাকি আছে। সবচেয়ে বেশি চীনের ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ মূলধন। এ ছাড়া ভারতের ৮ দশমিক ৪, পাকিস্তানের ১ দশমিক ২, বাংলাদেশের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এর আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, অর্থনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির অভিপ্রায় থেকেও চীন এআইআইবি গঠন করছে। বাংলাদেশ এর সদস্য হতেই পারে। তবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংস্থাটি থেকে এককভাবে ঋণ নেওয়া ঠিক হবে না।