
কোভিড-১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে যখন অর্থনীতির প্রচালিত সব নিয়মকানুন ভেঙে পড়ছে, তখন অর্থনীতিবিদ লরেন্স এইচ সামার্স প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের পার্থক্য মনে করিয়ে দিলেন। বললেন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে কোনো একটি তত্ত্ব একবার প্রমাণিত হলে তা সব কালে ও সবখানে সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু অর্থনীতির তত্ত্বের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, এটি পরিপ্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে।
বিষয়টা হলো, ম্যালথাস খাদ্যের প্রাপ্যতা নিয়ে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেটি তাঁর সময়ের মিলিয়ন বছর আগের জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর এটি আর কার্যকর নয়। তেমনি কেইনসের তত্ত্ব মহামন্দার সময় যতটা কার্যকর ছিল, ১৯৭০-এর দশকের মূল্যস্ফীতির সময় ততটা কার্যকর ছিল না।
এই পরিস্থিতিতে লরেন্সসহ অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির মাধ্যমে যে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করে, এই তত্ত্ব মহামারির সময় ঠিক খাটছে না। এই তত্ত্বের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হলে নীতি ভুলপথে পরিচালিত হতে পারে। এই তত্ত্ব দিয়ে ১৯৯০-এর দশকে জাপানের মুদ্রা অবনমন বা বৈশ্বিক আর্থিক সংকট বোঝা যাবে না। ধীরলয়ের পুনরুদ্ধার, এক দশকের পুনরুদ্ধারকালের মূল্যস্ফীতির নিম্ন গতি ও উচ্চ পরিমাণের সরকারি ঋণের মহিমাও বোঝা যাবে না, যে ঋণের প্রকৃত সুদহার ছিল অনেক কম।
এই পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি বুঝে যদি কার্যকর নতুন নীতি প্রণয়ন করতে হয়, তাহলে অর্থনীতিবিদদের ‘পুরোনো কেইনসীয় অর্থনীতির নতুন ধারা’ তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন লরেন্স এইচ সামার্স, যার ভিত্তি হবে আলভিন হানসেনের ডিপ্রেশন এরা অব সেক্যুলার স্ট্যাগনেশন, বাংলায় দাঁড়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্লথগতির মন্দাকাল।
একদিকে করোনাজনিত দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, অন্যদিকে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত কারণেও বিনিয়োগ কমে যাবে বলে মনে করছেন লরেন্স। শিল্পপ্রধান দেশগুলোর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আগামী এক দশকে কমে যাবে। চীনের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীও কমে গেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছে। এসব কারণে মূলধনী পণ্যের চাহিদা কমে যাবে। অন্যদিকে মূলধনী পণ্য কেনার জন্য যে পরিমাণ সঞ্চয় মানুষের থাকা দরকার, তা সেই পরিমাণে থাকছে না। কারণ, আইটি পণ্যেও দাম ব্যাপক হারে কমে গেছে। প্রতিবছরই তা কমছে। এখন ৫০০ ডলারের আইফোন দিয়ে এক দশক আগের ক্রে সুপার কম্পিউটারের চেয়ে বেশি কাজ করা যায়। এসব পণ্যের দাম কমার কারণে এই খাতে বিনিয়োগও কমছে। অন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে আগের মতো অত বিনিয়োগ আর লাগে না।
অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশের সঙ্গে অর্থনীতির ছোট হওয়ার সম্পর্ক আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ই-কমার্স আসার কারণে শপিং মলের চাহিদা কমে গেছে। ক্লাউড সেবার কারণে কার্যালয় বা ফাইলিং ক্যাবিনেটের চাহিদা কমে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন শহরের মধ্যে কোথাও যাওয়ার জন্য চাইলেই গাড়ি পাওয়া যায়, উন্নত দেশে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে বিমান, সবকিছুই পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে ভরতে গাড়ি বিক্রি হ্রাসের কথা বলা যায়। করোনার অনেক আগে থেকেই বিক্রি প্রতি মাসে কমছিল। মানুষের সক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে উবার ও ওলার মতো সেবা গাড়ির চাহিদা হ্রাসের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। আর এসব কিছুর মোদ্দা কথা হচ্ছে, বিনিয়োগের চাহিদা ব্যাপক হারে কমে গেছে।
অন্যদিকে বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণে ধনী মানুষের হাতে টাকা জমছে। কিন্তু তাদেরও তো ব্যয়ের সীমা আছে। আচরণগতভাবে দেখা যায়, আনুপাতিক হারে ধনীদের ব্যয়ের হার কম। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে করপোরেট মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় এবং সুদের হার কম থাকায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রিটেইন্ড আয় বেড়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনার প্রভাব। মহামারি বা দুর্যোগের সময় ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, মানুষ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে যায়। চীনে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর দেখা গেছে, মানুষ এখন অফিস থেকে পড়িমরি করে বাসায় ঢুকে যাচ্ছে, বারে বা রেস্তোরাঁয় যাওয়ার হার অনেক কমে গেছে এবং একেবারেই প্রয়োজনীয় না হলে মানুষ খরচ করছে না।
এখন কথা হলো, লরেন্স এইচ সামার্স বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী প্রথাগতভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজ সারবে, নাকি ভিন্ন কিছু করবে। অর্থনীতির সম্ভাবনার দিগন্ত প্রসারিত করার আগে তার সব সম্ভাবনা আগে পূরণ করতে হবে,এটাই চ্যালেঞ্জ। নিম্ন সুদহারের কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতা যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি উচ্চ সুদহারের জন্যও হয়। সে কারণে মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত সঞ্চয়ের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, সরকারের পথে নেমে আসা নয়, যার প্রভাব সব খাতের ওপরই পড়ে।
জাপান ও ইউরোপে সুদহার শূন্যের নিচে চলে গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২ শতাংশের নিচে। চাহিদা বাড়ানোর জন্য ভারতের সুদহার কমানো হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকার সুদহারের একটি অংশ বহন করার ঘোষণা প্যাকেজে দেওয়ার পর সেই ঋণ নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। তবে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছেই।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপদ হলো, রাজস্ব ঘাটতি সত্ত্বেও করোনা মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ দিতে হচ্ছে। ব্যাংক থেকে বেশি বেশি ঋণ দিতে হচ্ছে। এতে ঋণমান কমে যাচ্ছে। ভারতের বেলায় যা হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, যে মুডিজ ভারতের ঋণমান কমিয়েছে, তারাই আবার বলছে, ঋণমান কমলেও ভারতকে ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
গোড়ার কথা হচ্ছে, চাহিদা বাড়ানো। গতবারের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জিও বারবার বলছেন, এখন রাজস্ব ঘাটতি বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভাবলে চলবে না। লকডাউন উঠে গেলে দীর্ঘ দিন চাহিদা কম থাকবে। সে জন্য গরিব মানুষের হাতে টাকা পৌঁছাতে হবে। নতুন যুগ নতুন চাহিদা দিয়ে আসে, অর্থনীতিকেও সেভাবে দাঁড়াতে হবে।