
তরুণদের জন্য গ্রামীণফোন কিংবা এয়ারটেল কনসার্ট আয়োজন করেছে। দেশসেরা ব্যান্ড তারকারা সেখানে গান গাইছেন। আনন্দিত ও উদ্দীপিত হচ্ছেন তরুণ-তরুণীরা। কিংবা রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, দেখলেন কোনো একটি কোম্পানির লোগো-সংবলিত একই ধরনের টি-শার্ট পরে কয়েকজন ব্যক্তি রাস্তার ধারের মানুষদের কী যেন বোঝাচ্ছেন।
এই যে কনসার্ট কিংবা লোক ধরে ধরে বোঝানো, এসব আসলে একধরনের বিপণন যোগাযোগ। নাম বিলো দ্য লাইন (বিটিএল)। প্রথাগত বিপণন যোগাযোগব্যবস্থা (বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড) যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় ভিন্ন ধারার এই যোগাযোগ। এসব আসলে বিজ্ঞাপনেরই নতুন ধরন।
রেডিও-টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো এখন গুরুত্ব দিচ্ছে নতুন ধরনের এসব কার্যক্রমের, যা মূলত অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা হয়। শুধু তাই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো এখন ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থাও গড়ে তুলছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশীয় বিজ্ঞাপনশিল্প এখন বেশ বৈচিত্র্যময়।
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সংগঠন অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এএএবি) হিসাবে বর্তমানে বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ সব মিলিয়ে দেশের বিজ্ঞাপনের বাজার অন্তত তিন হাজার কোটি টাকার। এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত ১০ হাজার মানুষের।
এএএবির সাধারণ সম্পাদক ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইউনিট্রেন্ডের চেয়ারম্যান মুনীর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবছর বিজ্ঞাপনের বাজার ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিজ্ঞাপন এখন আর আগের অবস্থায় নেই। এই খাতে এখন নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
রেডিও কিংবা টেলিভিশনের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি এ দেশে নতুন নয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এটা হয়ে আসছে। অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানোর মাধ্যম এটি। বিপণন যোগাযোগের ভাষায় একে বলা হয় অ্যবাভ দ্য লাইন (এটিএল)। বিজ্ঞাপন ছাড়াও এটিএলের আওতায় আছে বিলবোর্ড (আউটডোর) ও সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক ছোট-বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থা রয়েছে। তবে বাজারের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই বড় বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর দখলে।
গ্রে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গাউসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে বিজ্ঞাপনের বাজার বৃদ্ধির বড় কারণ হলো বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে এখন প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এই প্রতিযোগিতা যত বাড়বে তত আমাদের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। আর আমাদের প্রয়োজনীয়তা যত বাড়বে বিজ্ঞাপনশিল্পও তত বড় হবে।’
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে বিজ্ঞাপন তৈরি করে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বিজ্ঞাপন বানায়। কিছু ক্ষেত্রে প্রোডাকশন হাউসকে দিয়ে বানায়। দেশে ছোট-বড় ৫০-৬০টি প্রোডাকশন হাউসও গড়ে উঠেছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন তৈরির জন্য বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে প্রথমে একটি কৌশল তৈরি করতে হয়। এ কাজে প্রথমেই প্রয়োজন হয় বাজার গবেষণার। দেশে এমন বাজার গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১০টি; নিয়েলশন, এমআরসি মোড, মিলওয়ার্ড ব্রাউন তেমনই প্রতিষ্ঠান। এরা মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে।
সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর আয়ের একটি বড় অংশই আসে মিডিয়া বায়িং হাউসের মাধ্যমে। বড় সংস্থাগুলোর প্রায় সবারই মিডিয়া বায়িং হাউস আছে। এই হাউসগুলো গণমাধ্যমের জায়গা কিংবা সময় কিনে নিয়ে তাদের মতো করে বিজ্ঞাপন দেয়।
বিজ্ঞাপনের বাইরেও কীভাবে মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানো যায় সেই চিন্তা থেকেই আসে বিটিএল। এর আওতায় পড়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট (কনসার্ট আয়োজন, প্রেস কনফারেন্স, বার্ষিক সাধারণ সভা-এজিএম) ও ইনডোর ইভেন্ট করা।
দেশে অসংখ্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ৩০-৪০টি। বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর প্রায় সবারই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠান কনসার্ট আয়োজন, প্রেস কনফারেন্স, মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান, এজিএম ও ইনডোর ইভেন্ট আয়োজন করে থাকে। সম্প্রতি ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’র মতো বিশাল আকারের অনুষ্ঠানও আয়োজন করেছে দেশীয় একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান।
বিটিএলের আওতাধীন আরেকটি বড় কাজ হলো কোনো একটি ব্র্যান্ড কিংবা সামাজিক ইস্যুকে উৎসাহিত করা (ব্র্যান্ড বা সোশ্যাল অ্যাকটিভেশন)। প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা রাস্তার ধারের মানুষদের বোঝানোটাই হচ্ছে ব্র্যান্ড অ্যাকটিভেশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিএলের আওতায় দেশে বছরে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার কাজ হয়।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান যেসব অনুষ্ঠান আয়োজন করে তার কিছু করে থাকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানও। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের প্রচারণার দিকটি দেখে। পাঁচটি বড় জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান দেশে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে আনুমানিক ১৫ কোটি টাকার কাজ করে থাকে।
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো বলছে, দেশে এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হচ্ছে ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থা। যদিও এর যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়, তবে এর পরিধি দ্রুত বাড়ছে। কারণ, দেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে সে কারণেই ডিজিটাল ব্যবস্থায় যেতে হচ্ছে। দেশে এখন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা শুধু অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।
আবার অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রোফাইল ও রুচি বুঝে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। যেমন ফেসবুকে যাঁরা সিনেমা কিংবা তারকাদের সংবাদে বেশি ক্লিক করেন, তাঁদের নিউজ ফিডে তারকাদের করা বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। আবার ক্রোকারিজ পণ্যের প্রতি যাঁদের মনোযোগ বেশি তাঁদের পেজে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনই বেশি দেওয়া হচ্ছে।
গ্রের গাউসুল আলম বলেন, ‘ডিজিটাল মার্কেটে মাত্র কাজ শুরু হলেও এটাই সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। দেশে এক কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন। একটা বার্তা দেওয়ার জন্য এক প্ল্যাটফর্মে এত লোক আর কোথায় পাওয়া যাবে। তাই ডিজিটাল মার্কেটকে লক্ষ্য করেও এখন কাজ হচ্ছে। অনেক ভিডিও তৈরি হচ্ছে, যেটা টিভিতে যায় না, অনলাইনে দেওয়া হয়।’
এশিয়াটিক মার্কেটিং কমিউনিকেশনশের নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌস হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আকারের দিক থেকে দুই হাজার কোটি টাকার বড় হলেও বিজ্ঞাপনশিল্পকে সরকার এখনো শিল্পের স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে সরকারি সহায়তা কিংবা প্রণোদনা পাওয়া যাচ্ছে না।