মোস্তাফিজুর রহমান
মোস্তাফিজুর রহমান

অভিমত

ঋণ বিতরণে সতর্ক হতে হবে

বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছে, তার প্রয়োজন ছিল। অর্থনীতিতে গতি আনতে এই প্রণোদনা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বন্ধ কারখানা চালু করতে চলতি পুঁজি এবং অতি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের অর্থায়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া।

গত কয়েক বছরে উৎপাদন ও শিল্প খাতে নানা ধরনের সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। আমার মূল্যায়ন হলো—এই বাস্তবতায় স্বল্প সুদে পুনঃ অর্থায়নের উদ্যোগ শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এ ধরনের ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাস্তবিক অর্থে উৎপাদনে ফিরতে সক্ষম, কেবল সেগুলোকে যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এই সহায়তার আওতায় আনা উচিত। তা না হলে প্রশাসনিক বা অব্যবসায়িক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ করা হলে অর্থ ফেরত না আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।

এর আগে করোনাভাইরাসের প্রকোপের সময় যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তা যেমন অনেক উদ্যোক্তার কাজে এসেছে, তেমনি কিছু অর্থ ফেরত আসেনি। মনে রাখতে হবে, সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে এই ঋণসহায়তা দিচ্ছে। এটা এককালীন সহায়তা নয়।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা—দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। গ্রাহকেরা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন, বাকি অংশ সরকার ভর্তুকি দেবে। এই সহায়তার বদৌলতে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো আবার চালু হলে সেখানে যে শ্রমিক ও কর্মচারীরা কাজ করতেন, তাঁরা আবার কাজে ফিরতে পারবেন।

আমার মতে, কোন প্রতিষ্ঠান কত ঋণ পাবে, কত সময়ের জন্য পাবে—এসব বিষয়ে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা থাকা উচিত। প্রশাসনিকভাবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ না রেখে বিষয়টিকে ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি কার্যকর হবে।

তবে সিএমএসএমই খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো যেতে পারে বলে আমি মনে করি। এই খাতের উদ্যোক্তারা সাধারণত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন। সে জন্য পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচিতে তাঁদের জন্য তুলনামূলক বড় অংশ রাখা হলে তা বেশি কার্যকর হতো। একই সঙ্গে বন্ধ কারখানাগুলোর বিষয়ে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা করা হলে আরও সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে।

আবার যে কারখানার তিন কোটি টাকা চলতি পুঁজি দরকার, সেটিকে এক কোটি টাকা দিলে লাভ হবে না। ধরা যাক, তিনটি কারখানার তিন কোটি টাকা করে প্রয়োজন; কিন্তু সবাইকে এক কোটি করে দেওয়া হলো, এতে কারও লাভ হবে না।

অন্যদিকে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, উত্তরবঙ্গে কৃষিকেন্দ্র স্থাপন ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দের বিষয়গুলো আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। বিশেষ করে সৃজনশীল অর্থনীতিতে বরাদ্দ নতুন ও অভিনব উদ্যোগ। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড থাকা জরুরি।

সামগ্রিকভাবে, সীমিত সম্পদ অকার্যকরভাবে ব্যবহার না করে যেসব প্রতিষ্ঠান বাস্তবিকভাবে টিকে থাকতে পারবে এবং উৎপাদনে ফিরতে পারবে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়াই বেশি যৌক্তিক হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)