ফয়সাল ইসলাম
ফয়সাল ইসলাম

ধনীদের ওপর সারচার্জ কীভাবে বসে, কেন বসে

বাংলাদেশে করকাঠামো এখন অনেক বেশি গতিশীল। সম্পদশালী নাগরিকদের কাছ থেকে রাষ্ট্রের বাড়তি অবদান নিশ্চিত করতে সরকার চালু করেছে সারচার্জ ব্যবস্থা, যা একধরনের বাড়তি কর, যা সম্পদের পরিমাণ বা বিশেষ শর্তের ওপর নির্ভর করে দিতে হয়। সহজভাবে বললে, যাঁর সম্পদ যত বেশি, তার করও তত বেশি।

বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৫ অনুযায়ী, তিন ধরনের সারচার্জ প্রচলিত আছে। এগুলো হলো সম্পদের ওপর সারচার্জ, পরিবেশ সারচার্জ ও বিশেষ সারচার্জ। শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির উপায় নয়, এটি সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার। ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশি অবদান আদায়, পরিবেশসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজে সমান সুযোগ সৃষ্টি—এই তিনটি লক্ষ্য পূরণে সারচার্জের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।

কেন সারচার্জ গুরুত্বপূর্ণ

সারচার্জের মূল উদ্দেশ্য একেবারে স্পষ্ট, যাঁরা দেশের সম্পদ ও সুযোগের বড় অংশ ভোগ করেন, তাঁরা যেন দেশের উন্নয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি অবদান রাখেন। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রতিবন্ধী অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সমতা রক্ষায়ও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আপনি যদি উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হন, একাধিক গাড়ি ব্যবহার করেন বা তামাক বা শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাহলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সারচার্জ–সংক্রান্ত নিয়মাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে ভুলবেন না।

রিটার্নের সঙ্গে সারচার্জ প্রদানের তথ্য ও পরিশোধের কাগজপত্র সংযুক্ত করাও বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রের রাজস্ব ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সারচার্জ এখন আর শুধু বাড়তি কর নয়, এটি একপ্রকার সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতীক।

সম্পদের ওপর সারচার্জ

একজন স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাকে আয়করের পাশাপাশি সারচার্জ দিতে হবে, যদি—এক. করদাতার নিট সম্পদ চার কোটি টাকার বেশি হয়; দুই. করদাতার নামে একটির বেশি মোটরগাড়ি থাকে; তিন. করদাতার আট হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাট থাকে।

নিট পরিসম্পদের পরিমাণ বলতে আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ১৬৭ অনুযায়ী পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণীতে প্রদর্শনযোগ্য নিট পরিসম্পদের পরিমাণ বোঝাবে। এই সারচার্জ হিসাব করা হয় তাঁর করযোগ্য আয়ের ওপর নির্ধারিত করের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ প্রথমে তাঁর আয়কর নির্ধারণ করা হয়, তারপর সেই করের ওপর নির্দিষ্ট হারে সারচার্জ যোগ করা হয়। ২০২৫-২৬ করবর্ষে ন্যূনতম কর সারচার্জের ভিত্তি হবে কিন্তু ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে ন্যূনতম কর সারচার্জের ভিত্তি হবে না।

সম্পদ সারচার্জ কত

যদি কোনো ব্যক্তির নিট সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়, তবে তাঁর ওপর কোনো সারচার্জ প্রযোজ্য হবে না। নিট সম্পদের পরিমাণ যদি ৪ কোটি টাকার অধিক কিন্তু ১০ কোটি টাকার অধিক না হয় অথবা ওই ব্যক্তির নিজ নামে একের অধিক মোটরগাড়ি থাকে অথবা তাঁর গৃহসম্পত্তির মোট আয়তন ৮ হাজার বর্গফুটের অধিক হয়, তবে তাঁর ওপর ১০ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।

নিট সম্পদের পরিমাণ যদি ১০ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ২০ কোটি টাকার বেশি না হয়, তাহলে এর ওপর ২০ শতাংশ সারচার্জ আরোপ হবে। আবার নিট সম্পদের পরিমাণ যদি ২০ কোটি টাকার বেশি কিন্তু ৫০ কোটি টাকার বেশি না হয়, তাহলে সারচার্জের হার হবে ৩০ শতাংশ। নিট সম্পদের পরিমাণ যদি ৫০ কোটি টাকার বেশি হয়, তাহলে ৩৫ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।

পরিবেশ সারচার্জ

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তির একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে তাঁর একের অধিক প্রতিটি গাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ প্রদান করতে হয়। মোটরগাড়ি বলতে বাস, মিনিবাস, কোস্টার, প্রাইম মুভার, ট্রাক, লরি, ট্যাংকলরি, পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল ছাড়া অন্যান্য মোটরযান অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে ভালো খবর হলো, ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) ক্ষেত্রে পরিবেশ সারচার্জ আরোপ করা হবে না।

পরিবেশ সারচার্জের যত নিয়ম

১. একাধিক গাড়ির মধ্যে সবচেয়ে কম হারে করযোগ্য গাড়ি ছাড়া বাকি প্রতিটি গাড়ির জন্য সারচার্জ দিতে হবে।

২. গাড়ির নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নের সময় উৎসে কর কর্তৃপক্ষই সারচার্জ সংগ্রহ করবেন। যদি একাধিক বছরের জন্য নিবন্ধন হয়, তাহলে পরের বছরগুলোর ৩০ জুনের মধ্যে সারচার্জ দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে না দিলে পুরোনো ও নতুন বছরের সারচার্জ একসঙ্গে দিতে হবে। এই সারচার্জ ফেরতযোগ্য নয় এবং অন্য কোনো করের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্যও নয়।

২০২৫-২৬,২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ করবর্ষের পরিবেশ সারচার্জের হার যদি কোনো ব্যক্তির মোটরগাড়ি থাকে, তবে তার ইঞ্জিনের ক্ষমতা বা শক্তির ওপর ভিত্তি করে পরিবেশ সারচার্জ আরোপিত হবে।

১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ হবে ২৫ হাজার টাকা; ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াটের বেশি কিন্তু ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের বেশি নয়—এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ নির্ধারিত হয়েছে ৫০ হাজার টাকা; ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াটের বেশি কিন্তু ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের বেশি নয়—এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ হবে ৭৫ হাজার টাকা; ২৫০০ সিসি বা ১২৫ কিলোওয়াটের বেশি কিন্তু ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের বেশি নয়—এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জের হার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াটের বেশি কিন্তু ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের বেশি নয়—এমন প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য সারচার্জ হবে ২ লাখ টাকা। আর ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের অধিক ক্ষমতার প্রতিটি মোটরগাড়ির জন্য পরিবেশ সারচার্জ নির্ধারিত হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বিশেষ সারচার্জ সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক করদাতার ওই ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের ওপর আড়াই শতাংশ হারে সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে। কোনো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির গম্যতার ক্ষেত্রে দেশে বলবৎ আইনি বিধান অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা না রাখলে ওই প্রতিষ্ঠানের অর্জিত আয়ের ওপর আড়াই শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, সারচার্জ এখন আর কেবল বাড়তি কর নয়; বরং এটি একটি লক্ষ্যভিত্তিক রাজস্ব নীতি, যা ধনীদের ন্যায়সংগত অবদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারকে শক্তিশালী করে।