সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম
সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম

এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ল, প্রস্তুতি কতটা এগোল

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের গতকাল বৃহস্পতিবার রাতের সভায় বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর।

এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য একদিকে অতিরিক্ত প্রস্তুতির সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের অপূর্ণতাকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আর্থিক সংকট নিঃসন্দেহে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে? একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয় কিংবা কিছু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; বরং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামর্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান বিভিন্ন শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতা ও সম্ভাব্য শুল্কের চাপে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সহজ শর্তে বৈদেশিক অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং কিছু বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।

অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো সীমিতসংখ্যক পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতিও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় শুধু উত্তরণের আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; বরং উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

সুতরাং উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়াকে কোনো জাতীয় সাফল্য হিসেবে উদ্‌যাপন না করে বরং অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আগামী তিন বছরে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সংস্কার যেন কেবল নীতিনির্ধারণী বক্তব্য বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব অর্থনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটে। কারণ, ২০২৯ সাল কোনো জাদুকরি সমাধান নয়; প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি ছাড়া সেই সময়েও বাংলাদেশ একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। অতএব সময় বাড়ানো নয়, বরং এই বাড়তি সময়কে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সেলিম রায়হান, অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম