সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন

সরকারকে ‘এ’ দিতে চাই, কিন্তু টানছে ‘বি’র দিকে: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। সরকারের প্রথম ছয় মাস, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও আগামী দিনের করণীয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শওকত হোসেন

প্রশ্ন

সরকারের প্রথম ছয় মাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন একেকজন একেকভাবে করবেন। এটি দৃষ্টিভঙ্গি, প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও উত্তরাধিকার নিয়ে এসেছে। কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বাংলাদেশের আচরণে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। একদিকে উচ্চাশা, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সরকার ছয় মাস কাটিয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে জ্বালানির সমস্যা, আঞ্চলিক নানা জটিলতা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সমস্যার মতো অভাবনীয় পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে, সরকার যেসব আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও হোঁচট খেয়েছে। অনেক সময় আপনি হয়তো চান, কিন্তু করতে পারেন না—আমার দৃষ্টিতে এ রকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন

আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও বাস্তবায়নে হোঁচট খেল কেন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: পরিস্থিতির সামগ্রিক উপলব্ধির ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি ছিল। মন্ত্রীরা এখন বলছেন, তাঁরা উত্তরাধিকারসূত্রে খুব খারাপ পরিস্থিতি পেয়েছেন। কিন্তু কী পেয়েছেন, তার কোনো দলিল তৈরি করেননি। আমি আগেও বলেছি, তাঁদের কোনো শ্বেতপত্র নেই। এর একটি কারণ হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়ে তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অনিশ্চয়তা।

পরিস্থিতির বেঞ্চমার্ক বা সূচনাবিন্দু বোঝার ক্ষেত্রেও অসুবিধা ছিল। মন্ত্রীরা দেরিতে এসে এখন বলছেন, এক বা দুই বছরে পারবেন না। এই কথাগুলো আগে বলা হয়নি।

বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম প্রশাসন। কিন্তু প্রশাসনের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বস্তিদায়ক অবস্থা ছিল না, এখনো নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা পরিষ্কারভাবে দেখেছি, আমলাতন্ত্র কীভাবে কাজের গতি ধীর করে দেয়। এই সরকারও সেই সমস্যায় পড়েছে। আমলাতন্ত্রের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহও রয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য আমলাতন্ত্রের বাইরে আইনশৃঙ্খলাও বড় বিষয়। সরবরাহব্যবস্থায় চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাজার অর্থনীতি চালু রাখতে যে নিরাপত্তা প্রয়োজন, তা ফিরে আসেনি। পুলিশের দুর্বলতা এবং পুলিশ প্রশাসনকে নতুন করে সাজানোর সমস্যাও এখানে ভূমিকা রেখেছে। সমস্যার সামগ্রিক উপলব্ধিতে সরকারের ঘাটতি ছিল; বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্র, তৃণমূলের আইনশৃঙ্খলা এবং দলীয় কর্মকাণ্ডও সহায়ক হয়নি।

আবার সাংগঠনিক পরিস্থিতি গুছিয়ে তোলার প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। জাতীয় সম্মেলনের প্রক্রিয়াও শেষ হয়নি। সে কারণে আমি সরকারকে কিছুটা সময় দিতে রাজি আছি।

তবে সব ক্ষেত্রে সরকারের সামাজিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আছে, তা দেখা যাচ্ছে না। এক নম্বর ব্যক্তি একটি কথা বলেন, কিন্তু অন্যরা তা শুনেও কাজে প্রয়োগ করেন না। বাজার অর্থনীতি চলবে, অথচ বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা দেওয়া হবে না, এটি হতে পারে না।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
প্রশ্ন

দল সরকারের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার প্রভাব কি অর্থনীতিতেও পড়ছে?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, দলের সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন। এবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সাধারণ সম্পাদক হন, নাকি সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হন, সেটি দেখার বিষয়। আমাদের ধারণা ছিল, বিএনপি ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি অনুসরণ করবে। এ কথা তারাই বলেছিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এক নেতা, এক পদ কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যায়। তখন সরকারের ব্যর্থতা সরাসরি দলের ওপর বর্তায় না। বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা বা সরকার পতনের আন্দোলনের বিপরীতে দলের ভেতরে গঠনমূলক আলোচনা থাকে। সরকারের কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিও তৈরি হয়। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, তারা এটি রাখবে।

কিন্তু অস্বস্তি তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। পদধারী রাজনীতিবিদদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা হয়েছে। এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিষ্কারভাবে দেখা দেয়। আস্থাভাজন লোককে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি দলীয় পদ ছাড়ছেন না, এটাই অস্বস্তির বিষয়।

একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাঁদের উপাচার্য করা হয়েছে, তাঁদের অনেকে নিঃসন্দেহে সংগ্রামী মানুষ; তাঁদের ত্যাগ আছে এবং দীর্ঘদিন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যার জায়গা। এখানে মেধার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ছয় মাসের মূল্যায়নে সদিচ্ছা বাস্তবায়নের ঘাটতি এখানেও দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’; মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতাসক্ষম অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। কিন্তু এই ছয় মাসে মেধাকে সমর্থন করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন আছে। এ ক্ষেত্রে সরকার এখনো কুণ্ঠিত। পুরোনো কৌশলেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হয়। এটি অর্থনীতির জন্য উপকারী নয়।

আবার বিদেশ থেকে অনেক যোগ্য মানুষ এসেছেন। তাঁরা হয়তো দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ছিলেন না, কিন্তু পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে। কিছু পরিবর্তন ও যোগাযোগ দেখা যাচ্ছে। এটিও মনে রাখতে হবে, ৩৫০ সংসদ সদস্যের মধ্যে প্রায় ২২৫ বা ২৩০ জন নতুন। তাঁদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জীবনে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেননি। সে কারণে তাঁদের কিছুটা সময়ও দিতে হবে।

প্রশ্ন

পুরোনো ধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা কি সত্যি হচ্ছে?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: বিগত সরকার উন্নয়নের এমন একটি বয়ান তৈরি করেছিল, যা এখন আমরা জানি অনেকটাই ফাঁপা ছিল। ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও তা ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি ছিল না। রাজনৈতিক বৈধতার ঘাটতি পূরণে তারা এই বয়ান ব্যবহার করত। বর্তমান সরকার নির্বাচিত ও বৈধ; দ্রুত জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন তাদের নেই।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড নিয়ে সবাই আলোচনা করেন, আমরাও করি। মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জন্য সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে আমরা শতভাগ একমত। এ জন্য অভিন্ন তথ্যভান্ডার, জবাবদিহি এবং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে দেখভালের প্রয়োজন—এসব নিয়েও আমরা বক্তব্য দিয়েছি।

কিন্তু প্রতিবছর ২০–২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে কাদের কথা বেশি ভাবতে হবে? বৈষম্যবিরোধী গণ-আন্দোলনে যেসব তরুণ কোটা ও চাকরির কথা বলেছেন, তাঁদের হয় চাকরি দিতে হবে, নয়তো উদ্যোক্তা বানাতে হবে। গত ছয় মাসে এ জায়গায় যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি।

সরকারের মন্ত্রীরা কি গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁরা কত মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন? কর্মসংস্থানের যে হিসাব তাঁরা দিয়েছেন, সেটিও ঠিকভাবে কেউ উপস্থাপন করেন না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্থনীতির চালিকা শক্তি। সামাজিক সুরক্ষা হলো মানুষের কষ্টের জায়গায় সাময়িক সহায়তা। কিন্তু সরকার জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপের দিকে গেছে।

তবে শিক্ষা খাতের সংস্কার নিয়ে সরকার যা বলেছে, তার সঙ্গে আমাদের বক্তব্যের শতভাগ মিল আছে। শিশুদের দুপুরের খাবার দিতে হবে, পোশাক ও জুতা দিতে হবে। ডিজিটাল বিভাজন কমাতে হবে। কিন্তু প্রত্যেককে ল্যাপটপ বা ট্যাব দেওয়ার কথা বললে, সরবরাহ কে করবে, সে প্রশ্নও করতে হবে। দোয়েল ল্যাপটপের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে আছে। তাই সুশাসনের জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
প্রশ্ন

বাজেট ও বেতনকাঠামোর ক্ষেত্রে সরকারের ভুলটি কোথায়?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: বাজেটের সময় আমরা বলেছিলাম, জনগণকে সত্য কথা বলুন। উত্তরাধিকারসূত্রে খারাপ অবস্থা পাওয়ার কথা এখন কেন বলা হচ্ছে? ছয় মাস আগে কেন বলা হয়নি? তখন একটি দলিল করে বলা যেত, ‘দেখুন আমরা কী পেয়েছি; এক বছর কিছু দিতে পারব না।’

আমরা আরও বলেছিলাম, এমন বাজেট করবেন না, যা বাস্তবায়ন করা যাবে না। বিগত সরকারের সময় এটি দেখেছি। রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দেড় গুণ করা হলো, অথচ তা অর্জন করা সম্ভব নয়। সেই টাকা না এলে ব্যয় হবে কোথা থেকে?

সরকার এখন নতুন বেতনকাঠামো দিতে পারছে না। অথচ এটি খুবই দরকার। প্রায় ১০ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সেভাবে বাড়েনি, কিছু ছোটখাটো সুবিধা ছাড়া। শুধু উচ্চপদস্থদের কথা বলছি না। পিএটিসিতে বেতনকাঠামো নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বের হওয়ার সময় একজন দারোয়ান আমাকে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি পেঁপে আর আলু খেয়ে কত দিন থাকব?’ সরকারি চাকরিতে নানা স্তরের মানুষ আছেন। তাঁর কথার উত্তর আমি দিতে পারিনি। বাজেটঘাটতি বাড়লে মূল্যস্ফীতি হবে—এসব বুঝিয়ে এসেছি, কিন্তু তাঁর কথার সামনে অসহায় হয়ে গেছি।

সরকারে ২৮ জনের সঙ্গে আরও ২৮ জন—৫৬ জন আছেন। দুই স্তরের একটি মন্ত্রিসভা, আরেকটি পরামর্শক সভা। এই দুই পরামর্শক সভা পরিচালনার জন্য আবার বিশেষ সহকারীরা আছেন। সব মিলিয়ে সমন্বয় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন

জ্বালানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি কীভাবে দেখছেন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: এই সরকার শুরুতেই পরিস্থিতি গুছিয়ে নেয়নি। তারা মনে করেছে, মানুষকে উচ্চাশা দেখাতে হবে। কিন্তু জ্বালানিসংকট কি ছয় মাস আগে বোঝা যায়নি? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরেকটি এলএনজি প্রকল্প বাতিল হলে তার ফলাফল কী হবে, সেটি কি বোঝা যায়নি? এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খোঁজা হচ্ছে। আমেরিকার সঙ্গে করা চুক্তিও বাতিল হয়নি। জ্বালানির ক্ষেত্রে যেসব সুযোগ ও নমনীয়তা ছিল, সেগুলো আটকে গেছে। সরকার ঠিকভাবে কাজ করেছে কি না, সে প্রশ্ন করতে হবে।

সামনে আমন ফসল আসবে, চারা রোপণ হচ্ছে। এরপর সার পাওয়া যাবে কি না, সেটিও প্রশ্ন। গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ। এখানে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার ছিল।

সরকারে ২৮ জনের সঙ্গে আরও ২৮ জন—৫৬ জন আছেন। দুই স্তরের একটি মন্ত্রিসভা, আরেকটি পরামর্শক সভা। এই দুই পরামর্শক সভা পরিচালনার জন্য আবার বিশেষ সহকারীরা আছেন। সব মিলিয়ে সমন্বয় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি আমদানির সঙ্গে অর্থায়ন ও ব্যাংক খাতের তারল্য যুক্ত। এগুলো মেলাতে না পেরে বেসরকারি খাত দিয়ে আমদানির চেষ্টা হচ্ছে। যাঁদের দিয়ে আমদানি করানো হচ্ছে, তাঁদের নামও খুব সুখকর নয়। এতে পুরোনো অলিগার্কদের ফিরিয়ে আনার বদনাম হচ্ছে।

সমন্বয়হীনতার আরেকটি উদাহরণ হলো, সরকার আইন করল যে ব্যাংকে পুরোনো মালিকেরা ফিরতে পারবেন। দুই মাস পর বুঝল, এটি টিকবে না; আইন সংশোধন করা হলো। মুদ্রানীতি তৈরির দুই সপ্তাহ পর আবার সুদের হার কমানো সমন্বয়ের অভাবের উদাহরণ। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও দক্ষতার অভাবও সরকারকে পীড়িত করছে।

প্রশ্ন

সমন্বয় ও সক্ষমতার ঘাটতি থেকে বের হওয়ার পথ কী?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সরকার কি নিজের ছয় মাসের মূল্যায়ন করেছে? তারা একটি পুস্তিকা বের করেছে। কিন্তু অতীতেও যে ধরনের পুস্তিকা বের হয়েছে, এবারও একই ধরনের পুস্তিকা হয়েছে। মনে হচ্ছে, পুরোনো ‘প্লেবুক’ বা কৌশলপত্র ধরেই এগোনো হচ্ছে।

একটি অভ্যুত্থান-উত্তর নির্বাচিত সরকারের আচরণ এমন হবে কেন? তারা সত্য কথা সত্যভাবে বলবে, বাস্তবতা তুলে ধরে মানুষের মন জয় করবে, ধৈর্য ধরতে বলবে এবং সাহসী বক্তব্য দেবে। একজন নেতা বলেছেন, ‘আমাদের ম্যানিফেস্টো পুরোটাই বাস্তবায়ন করে ফেলেছি, তার চেয়েও বেশি করেছি।’ তাঁর সময়জ্ঞান আছে বলে আমার মনে হয়নি।

তবে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার কার্যাবলি মূল্যায়ন করছেন—এমন কথা শুনে আমি উৎসাহিত হই। গোপনে একটি পদ্ধতিতে মূল্যায়ন হচ্ছে, নানা কমিটিও হচ্ছে। ছয় মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন হতে পারে। পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজের কোনো কাজের সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করতেন না; তাঁর সিদ্ধান্তে ভুল থাকতে পারে না—এমন মনোভাব ছিল। বর্তমান সরকার যদি ছয় মাসের মাথায় কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদকে জবাবদিহির মধ্যে আনে, সেটি বড় ব্যাপার হবে।

তবে পরিবর্তন হলেই ভালো হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এটি শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের বিষয়ও নয়। এখন যে আড়াই তলা মন্ত্রিসভা নিয়ে চলা হচ্ছে, সেই কাঠামোরও মূল্যায়ন করতে হবে। প্রধান ব্যক্তি শুধু ব্যক্তি ও মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন করবেন, কিন্তু যে কাঠামোর মধ্যে সব চলছে তার মূল্যায়ন করবেন না, এটি হতে পারে না। সদিচ্ছা আরও জোরদার করা, সক্ষমতা বাড়ানো এবং সমন্বয় শক্তিশালী করার বিষয়টি দেখতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
প্রশ্ন

এ মুহূর্তে অর্থনীতিতে সরকারের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি ‘কোর বাজেট’ বা মৌলিক বাজেট তৈরি করা, যেটি সরকার রক্ষা করবে। বর্তমান বাজেটের তিন মাসের মাথায় বোঝা যাচ্ছে, এটি রক্ষা করা যাবে না। সরকারের অগ্রাধিকারগুলো ঠিক রেখে যে অংশ বাস্তবায়নযোগ্য, সেটি রক্ষা করতে হবে। পুনরুত্থানের যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে এই বাজেট খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংশোধনের জন্য আগামী মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সরকারের বিভিন্ন খাতে কোনো রোডম্যাপ নেই। জ্বালানি খাতে রোডম্যাপ নেই। আর্থিক খাতের সংস্কারে বিচ্ছিন্নভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক খাতেরও কোনো রোডম্যাপ নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কিছু বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

অর্থনীতিতে নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা ও অনুমানযোগ্যতা দরকার। ভবিষ্যতের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে বিনিয়োগ হবে না। এ জন্য রোডম্যাপ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারের সুশাসনসংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইন অনুযায়ী তিন মাস পরপর প্রতিবেদন দিতে হবে। বাজেট-পরবর্তী অভিজ্ঞতা, সমন্বয় ও সক্ষমতার ঘাটতি, পরিবর্তিত বিশ্ব ও ভূকৌশলগত পরিস্থিতি মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীকে সংসদের সামনে বলতে হবে। এটি শুধু তাঁর একার দায়িত্ব নয়; সংসদের দায়িত্ব হতে হবে। বিরোধী দলও বারবার এ আলোচনার দাবি জানাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে ভালো কিছু থাকলে আমি করব।’ প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধী দলের প্রস্তাব—দুটিই আমার ভালো লেগেছে। আমরা সব সময় বিষয়টি সংসদে আনার কথা বলেছি। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কর্মপরিকল্পনাগুলো গুছিয়ে সংসদে নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান মূল্যায়নকারী তিনটি বৈদেশিক সংস্থাই দেশের অবনমন করেছে। তাদের বক্তব্য হলো, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে আরও বেশি সময় লাগবে। সরকারের বিনিয়োগের আগ্রহ ও উদ্যোগ আছে; বিনিয়ন্ত্রণসহ কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বলা ও করার মধ্যে ফাঁক রয়েছে। ইংরেজিতে যাকে ‘ওয়াকিং দ্য টক’ বলা হয়—আপনি যা বলেন, তা করেন কি না। এ জন্য সদিচ্ছা ও সক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার আগামী এক মাসে পরিস্থিতি গুছিয়ে নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। শুধু মন্ত্রিসভা নয়, পুরো ব্যবস্থা এবং দেশ পরিচালনার পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে আমি সেপ্টেম্বরকে দেখছি।

প্রশ্ন

চলমান গ্যাস ও জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় কী করা দরকার?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: পতিত সরকারের সময়ে বাপেক্সকে সক্রিয় ও বিনিয়োগ না করে দেশকে আমদানি লবির কাছে জিম্মি করা হয়েছিল। গত ছয় মাসে কয়টি কূপ খনন হয়েছে এবং সেখানকার গ্যাস সঞ্চালনের কী ব্যবস্থা হয়েছে, তা দেখতে হবে। এখানে বিদেশি বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে অন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে খুব খারাপ সংকেত যাবে।

এখন সমুদ্রে গ্যাস খোঁজা হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুবার দরপত্র দেওয়া হলেও কেউ আসেনি। এবার আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একদিকে সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মূল ভূখণ্ড ও সমুদ্র থেকে গ্যাস আহরণকে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। জ্বালানি খাতে একটি প্যাকেজ দেওয়ার প্রয়োজন এখনো রয়ে গেছে।

প্রশ্ন

বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কতটা উদ্বিগ্ন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: ২০২৩ সালে কোভিডের পরপরই আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে জটিল সময় হবে ২০২৬ সাল। তখন মেগা প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছিলাম, কোনটির ঋণ কখন পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন তার চেয়েও কঠিন। পতিত সরকার ৯–১০ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত দায় রেখে গেছে। জ্বালানি এনেছে, কিন্তু টাকা দেয়নি; বিদেশ থেকে পাওনা অর্থও আসেনি।

বাজেটঘাটতি ও অর্থায়নের প্রয়োজন আছে, বৈদেশিক মুদ্রাও দরকার। সরকার এবার ৮–৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিচ্ছে এবং বছরের শুরুতেই ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ করছে। এটি মারাত্মক বিষয়।

আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবতাবাদী রাষ্ট্রের কথা বলি। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে কত লাখ টাকার বোঝা চাপিয়ে যাচ্ছি, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনীতি নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়; বরং রাজনীতি দিয়ে অর্থনীতি পরিচালনার চেষ্টা করতে হবে। কাকে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী দিনের প্রকল্প কী হবে—এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবতার ভিত্তিতে নিতে হবে।

প্রতিটি প্রকল্পের জন্য ড্যাশবোর্ড থাকবে, সেখানে অগ্রগতি সবুজ বা লাল রঙে দেখানো হবে এবং আইএমইডি তা পর্যবেক্ষণ করবে—এ কথা শুনে আমি উৎসাহিত হয়েছি। দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার মেয়াদ বাড়ানোর সমস্যা এতে ধরা পড়তে পারে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যে দক্ষতা ও সময় দরকার, সরকার তা দিতে পারবে কি না এবং কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গে সংযোগ কতটা হবে, সেটিও দেখতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
প্রশ্ন

আর্থিক খাত সংস্কার কমিশন গঠন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। এর সঙ্গে পে কমিশনের প্রতিবেদনও আছে। এগুলোকে কীভাবে দেখছেন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: ইশতেহারে আর্থিক খাত সংস্কারে কমিশন গঠন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। এর সঙ্গে পে কমিশনের প্রতিবেদন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ও যুক্ত। এগুলো একই সূত্রে গাঁথা।

এসব করতে যে রাজনৈতিক শক্তি ও সম্পদ দরকার, সরকার রাজনৈতিক অর্থনীতির জায়গায় তা সামাল দিতে পারছে না। সংস্কার ঠেকানোর শক্তি এবং সংস্কারের পক্ষে চাপ—দুটিই আছে। কিন্তু সেগুলো মোকাবিলার শক্তি সরকারের এ মুহূর্তে নেই। একদিকে আমলাতন্ত্রের চাপ, অন্যদিকে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ কাজ করছে। তথ্যভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না।

প্রশ্ন

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: আমার প্রত্যাশা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভালো হবে। দলাদলি ও প্রতীকের বাইরে স্থানীয় গণ্যমান্য এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করতে হবে, যাঁরা স্থানীয় সরকারকে জীবিকা হিসেবে দেখবেন না। আমি সেখানে ভরসার জায়গা দেখি। স্থানীয় সরকারে কিছু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলে সংসদ সদস্যদের আচরণেও ভারসাম্য আসতে পারে। এটি দ্রুতই বড় বিষয় হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন

গত ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত কোনটি?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: গত ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনবৃত্তান্ত সরানো। পাঠ্যপুস্তকে এই তিনজনের জীবনবৃত্তান্তের প্রয়োজন নেই—এ সিদ্ধান্ত অসীম সাহসিকতার পরিচয়।

প্রশ্ন

অর্থনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত কোনটি?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অর্থনীতিতে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো নিজেদের ভুল সংশোধনের শক্তি দেখানো। সরকার অলিগার্কদের ব্যাংকগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল, পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নিজেরাই সমাধান করেছে। এর জন্য একধরনের সাহসিকতা প্রয়োজন।

প্রশ্ন

সবচেয়ে ভুল বা খারাপ সিদ্ধান্ত কোনটি?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সবচেয়ে ভুল বা খারাপ সিদ্ধান্ত হলো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পদায়ন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পদায়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটিই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

একবাক্যে ছয় মাসের মূল্যায়ন হলো—আরও সদিচ্ছা লাগবে, আরও সক্ষমতা লাগবে এবং আরও সমন্বয় দরকার হবে। সরকার এটি উপলব্ধি করবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।
প্রশ্ন

একবাক্যে ছয় মাসের মূল্যায়ন কী? সরকারকে কোন গ্রেড দেবেন?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: একবাক্যে ছয় মাসের মূল্যায়ন হলো—আরও সদিচ্ছা লাগবে, আরও সক্ষমতা লাগবে এবং আরও সমন্বয় দরকার হবে। সরকার এটি উপলব্ধি করবে বলে আমি প্রত্যাশা করি। আমি তাদের ‘এ’ দিতে চাই, কিন্তু টানছে ‘বি’র দিকে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
প্রশ্ন

আগামী ছয় মাসে কোন পাঁচটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার?

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: প্রথমত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানিসংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধান বের করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সমাধানে একটি বোধগম্য পথরেখা দিতে হবে। চতুর্থত, ব্যাংক ও জ্বালানির বাইরেও বিনিয়োগ সচল করার উপাদানগুলো—বিশেষ করে বিনিয়ন্ত্রণ ও করের বিষয়গুলো—সমাধান করতে হবে। পঞ্চমত, নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষায় কোনোভাবেই দুর্নীতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

(প্রথম আলো ডিজিটালের নিয়মিত আয়োজন ‘বার্তাকক্ষ’–তে গতকাল বুধবার এসেছিলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সাক্ষাৎকারটি তারই ভিত্তিতে তৈরি করা।)