স্নেহাশীষ বড়ুয়া
স্নেহাশীষ বড়ুয়া

অভিমত

ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তি, তবে ধীরে ধীরে ন্যূনতম করের বিধান থেকে সরে আসা উচিত

সরকার সম্প্রতি বার্ষিক দুই কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ক্ষেত্রে কর মওকুফের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও স্বাগত জানানোর মতো উদ্যোগ। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তারা অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হলেও তাঁরা মূলত বড় আকারের উদ্যোক্তা নন। ফলে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তাঁদের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি নিয়ে আসবে।

আগের নিয়মে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ের ওপর ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত টার্নওভার কর দিতে হতো। অনেক সময় দেখা যেত, নিয়ম (স্ল্যাব) অনুযায়ী কোনো ছোট উদ্যোক্তার প্রকৃত কর দায় হয়তো ২০ বা ২৫ হাজার টাকা; কিন্তু টার্নওভার করের কারণে তাঁকে বাধ্য হয়ে এক থেকে দুই লাখ টাকা কর পরিশোধ করতে হতো। স্বাভাবিকভাবেই এটি তাঁদের জন্য একটি বড় ধরনের আর্থিক বোঝা। নতুন পদক্ষেপে এই মওকুফ সুবিধা দেওয়ায় ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ভালো সাশ্রয় হবে।

তবে এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও থেকে যায়। বার্ষিক টার্নওভারের সীমা দুই কোটি টাকা করায় অনেকে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ খুঁজতে পারেন। যেমন কারও যদি প্রকৃত বিক্রি বা টার্নওভার চার বা পাঁচ কোটি টাকা হয়, তাঁদের কেউ কেউ এই কর মওকুফের সুবিধা নিতে মোট লেনদেন দুই কোটি টাকার নিচে দেখানোর চেষ্টা করতে পারেন।

এখানে রাজস্ব কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকি বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করতে হবে। গত বছর পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার চার কোটি টাকা থাকার পরে চলতি বছর হঠাৎ তারা যদি টার্নওভার অর্ধেকে নামিয়ে দুই কোটি টাকা দাবি করে, তবে তার পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। নিরীক্ষা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচমকা টার্নওভার হ্রাস পাওয়া ফাইলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় ব্যবসায়ের পরিধি সত্যিই কমেছে, নাকি তথ্য গোপন করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, করপোরেট কর ও ১ শতাংশ ন্যূনতম করের সমন্বয় কীভাবে হয়। বর্তমানে যদি একটি কোম্পানি ক্যাশলেস শর্ত পালন করে তবে করযোগ্য আয়ের ওপর করপোরেট করহার ২৫ শতাংশ। তবে একই সঙ্গে কোম্পানির মোট বিক্রির ওপর ১ শতাংশ ন্যূনতম কর দেওয়ার নিয়মও রয়েছে।

বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরুন, একটি কোম্পানি বছরে ১০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা করযোগ্য মুনাফা করল। ২৫ শতাংশ করহারে তার প্রদেয় কর দাঁড়ায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আবার ১০ কোটি টাকা বিক্রির ওপর ১ শতাংশ ন্যূনতম কর হিসাব করলে তা হয় ১০ লাখ টাকা। যেহেতু মুনাফার ওপর প্রদেয় কর (১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা) ন্যূনতম করের (১০ লাখ টাকা) চেয়ে বেশি, তাই এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর নিয়ে কোনো জটিলতা থাকে না।

জটিলতা হয় তখন, যখন মুনাফার পরিমাণ কমে যায়। যেমন কোম্পানিটি যদি ১০ কোটি টাকা বিক্রি করে ৩০ লাখ টাকা করযোগ্য মুনাফা করে, তবে ২৫ শতাংশ হারে তার প্রকৃত কর আসবে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু আইনের বাধ্যবাধকতায় ১ শতাংশ হারে তাকে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকাই দিতে হবে। অর্থাৎ সে আড়াই লাখ টাকা অতিরিক্ত কর দিল। বিদ্যমান কর আইন অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ভবিষ্যতে কর দায় বাড়লে তার সঙ্গে সমন্বয়ের (ক্যারি ফরওয়ার্ড) সুযোগ রয়েছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই ন্যূনতম করের ধারণাটি আয়কর আইনের পরিপন্থী। যদি করদাতারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সঠিক হিসাব প্রদর্শন করেন এবং তাঁদের অনুশাসন বা কমপ্লায়েন্স বৃদ্ধি পায়, তবে ধীরে ধীরে সরকারকে এই ন্যূনতম করের বিধান থেকে সরে আসা উচিত।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস