এমটিবির এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান
এমটিবির এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

এমটিবির এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

ব্যাংকের ৩৭ বছরের কর্মজীবনে প্রথম মন্দা দেখছি

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) প্রতিষ্ঠার ২৭তম বর্ষ উদ্‌যাপন করেছে। এ উপলক্ষে দেশের সার্বিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ সাকিব।

প্রশ্ন

সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত পেয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কারের সুফল পেতে কতটা সময় লাগতে পারে?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: আমাদের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি, এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত একের পর এক ধাক্কা দিয়েছে। তবে গত ১৭ বছরে ব্যাংক খাতেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক অধিগ্রহণের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। একসময় খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, এখন তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৭০-৭৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে সরকারি ও রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ১০-১২টি ব্যাংক থেকে। এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় বড় অঙ্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা জ্বালানির সংকট। দীর্ঘদিন ধরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কৃত্রিমভাবে জিডিপি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, কিন্তু ঋণের অর্থ কোথায় গেছে, তার জবাবদিহি ছিল না। যেমন ঢাকা-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর জানা গেল এর নকশাই ঠিক ছিল না; যে কারণে সম্প্রতি প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণেরও অর্থনৈতিক সুফল এখনো আসেনি। এসব ক্ষেত্রে কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।

অর্থ পাচারের কারণে গত সরকারের শেষ দিকে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং রিজার্ভ কমতে থাকে। কর্মসংস্থানও তেমন বাড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। এতে ডলার বাজার স্থিতিশীল হয়। তবে এসব সংস্কার সম্পন্ন করতে আরও পাঁচ বছর লাগবে। এরপর অর্থনীতিতে সুফল আসতে পারে।

প্রশ্ন

ব্যাংকিং সংস্কার হলেও অর্থনীতিতে টানাপোড়েন রয়েছে। ৬২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজে কি গতি ফিরবে?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: শুধু ব্যাংকিং খাত দিয়ে পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। আমাদের অন্যতম দুর্বলতা রাজস্ব খাত। কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। সরকারের নিজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু রাজস্ব আয় না থাকায় পরিচালন ব্যয়ের জন্য ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি শ্লথ হয়েছে এবং সহজ শর্তের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়েছে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও চরমে।

বৈশ্বিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্ফীতিও প্রভাব ফেলছে। আমাদের রেমিট্যান্সের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। দেশটির অর্থনীতি শ্লথ হলে লেনদেনের ভারসাম্যে বড় চাপ পড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ সময়োপযোগী হলেও ঋণগ্রহীতার যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতে ব্যাংকগুলোর দুই থেকে তিন মাস লাগে। তাই রাতারাতি ঋণ বিতরণ সম্ভব নয়।

প্রশ্ন

এই পরিস্থিতিতে সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে স্থানীয় বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়ানো এবং দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানসহ আট-দশটি প্রধান চালিকা শক্তি চিহ্নিত করে সেগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশে রোডশো করে বিনিয়োগ আনা যাবে না।

বিশ্বজুড়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও আমরা ঝুঁকি নিয়ে ৮০-৯০ শতাংশ সক্ষমতায় চালাচ্ছি। এতে যেকোনো সময় বড় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০-২০টি দেশ চিহ্নিত করতে হবে। সেসব দেশে দূতাবাসে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে, যাতে প্রবাসী শ্রমিকদের পাসপোর্ট নবায়নসহ অন্যান্য সেবা নিতে বারবার ঘুরতে না হয়।

প্রশ্ন

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে অগ্রগতি কতটা?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: পাচার হওয়া অর্থ চিহ্নিত করে তা ফেরত আনতে পাঁচটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার কাজ চলছে। ইতিবাচক দিক হলো, তারা ‘সাকসেস ফি’ ভিত্তিতে কাজ করবে। অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই তারা সেখান থেকে ফি নেবে। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি হলেও এতে দোষীদের কাছে বার্তা যাবে, টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে আরামে থাকা যাবে না।

গভর্নর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিভিন্ন আদালতে ব্যাংকগুলোর যেসব মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকে, সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে তদারক করছে। অনেক সময় ব্যাংকগুলোর অজান্তে একতরফা স্থগিতাদেশ দেওয়া হতো। এটি ঠেকাতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে আদালতের যেকোনো স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আইনজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন।

প্রশ্ন

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় করপোরেট গ্রুপের কারখানা ও ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়ায় ভালো ব্যাংকগুলোও চাপে আছে। আপনারা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: অতীতে অনেকে সক্ষমতার চেয়ে বড় প্রকল্প নিয়েছেন। যেমন দেশে বছরে স্টিলের চাহিদা ৪০-৫০ লাখ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় এক কোটি মেট্রিক টন। সরকারি মেগা প্রকল্পের ব্যস্ত সময়ে এসব কারখানা চললেও এখন প্রকল্প বন্ধ থাকায় কোম্পানিগুলো চাপে পড়েছে। অনেক পোশাক কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যের চাহিদা সব সময় থাকে। ব্যাংক হিসেবে আমরা এখনো তাদের ঋণপত্র (এলসি) খুলে উৎপাদন সচল রাখছি। তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের মোড়ক ছোট হচ্ছে। যেমন ২০০ গ্রামের প্যাকেট একই দামে ১০০ গ্রাম করা হচ্ছে।

সরকার এককালীন ঋণ পরিশোধের নীতিমালা করলেও বড় গ্রুপগুলোর পক্ষে এ সুবিধা নেওয়া অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কিনে নেওয়ার মতো ক্রেতা বাজারে নেই। তাই ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও ভালো ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমিয়ে সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামাচ্ছে। সাধারণ সঞ্চয়কারীরা কোথায় যাবেন?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা না থাকলে ব্যাংক অতিরিক্ত আমানত দিয়ে কী করবে? সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদের হারও কমে ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশে নেমেছে। ব্যাংককে নিজের তহবিল ৮-৯ শতাংশে বিনিয়োগ করতে হলে আমানতকারীকে এর চেয়ে বেশি সুদ দেওয়া সম্ভব নয়।

সাধারণ মানুষের প্রতি পরামর্শ, বেশি সুদের লোভে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখবেন না। অতীতে অনেকে বেশি সুদের আশায় দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এমনকি যাঁরা একসময় শরিয়াহ ব্যাংক ছাড়া টাকা রাখতেন না, তাঁরাও মূল অর্থ ফেরত না পেয়ে প্রচলিত ধারার ভালো ব্যাংকে আমানত রাখছেন। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৫-২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, বর্তমান মন্দার বাজারে নতুন ব্যবসা ছাড়া তাদের পক্ষে মুনাফা করে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।

প্রশ্ন

এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) কীভাবে ব্যবসা সাজাচ্ছে? করপোরেট থেকে কি রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বেশি জোর দিচ্ছে?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: ২০১৯-২০ সালের দিকে আমাদের আমানত ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে ৩৩-৩৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে আমাদের ঋণের ৮৯-৯০ শতাংশ ছিল বড় করপোরেট ঋণ। পরিকল্পিতভাবে তা কমিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশে এনেছি। আগামী পাঁচ বছরে করপোরেট ঋণ ৭০ শতাংশে নামিয়ে রিটেইল ও কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র (সিএমএস) খাতে ঋণের হিস্যা ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। মাঝারি শিল্পের ঋণ খেলাপি হওয়ার হার বেশি হওয়ায় আমরা এখন ছোট উদ্যোক্তাদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় ব্যাংকগুলোর মতো ২০-২৫ কোটি টাকা খরচ না করে নিজস্ব ডিজিটাল ব্যাংকিং টিম দিয়ে অ্যাপস সংস্কার করেছি। ফিনটেক পার্টনারশিপের মাধ্যমে মুঠোপে (মোবাইলকে পয়েন্ট অব সেল বা পোজ মেশিন হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি) চালু করেছি।

প্রশ্ন

দীর্ঘ ৩৭ বছরের ব্যাংকিং জীবন শেষ করতে যাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে মূলত প্রবৃদ্ধিশীল বাজার দেখে এসেছি। কিন্তু এবারই প্রথম দেশের অর্থনীতিকে প্রকৃত মন্দার মুখোমুখি হতে দেখলাম। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে মধ্যবিত্তের অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন, যা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

আগামী দিনে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের একত্রীকরণ (কনসোলিডেশন) অনিবার্য। বর্তমানে দেশে ৫৭টি ব্যাংক থাকলেও এর সবই টিকবে না। দেশের অর্থনীতির জন্য শীর্ষ ২০-২৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট। তারাই পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেবে। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থনীতিতে টিকে থাকতে ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পর্যাপ্ত মূলধন নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও মানসম্পন্ন মানবসম্পদ ধরে রাখা।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। শক্ত নীতিনির্ধারণ ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে আমরা সংকট কাটিয়ে আবার স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে পারব।