গত রাজনৈতিক সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের যে গল্প শুনেছি আমরা, সেটি দাঁড়িয়ে ছিল এক নড়বড়ে ভিত্তির ওপর। প্রবৃদ্ধির চটকদার শিরোনামের আড়ালে চাপা পড়েছিল অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা। বছরের পর বছর ধরে চলা অসামঞ্জস্যতা একদিকে বাড়িয়েছে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের কারণে খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশ্বের কয়টা দেশে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৩৫ শতাংশের বেশি, সেটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
শুধু কি খেলাপি ঋণ? আস্থার সংকটে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। পুঁজি পাচার হয়েছে ব্যাপকভাবে। আর মূল্যস্ফীতি উঠেছিল এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায়। সুদের হারের কৃত্রিম সীমা আরোপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ছাপানোর আগ্রাসী নীতি মূল্যস্ফীতির আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল। তথ্যের অস্বচ্ছতা পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতাকে আড়াল করে রেখেছিল, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করে।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং গণমানুষের দাবির মুখে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমদানিতে কঠোরতা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ফলে প্রবাসী আয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ শতাংশেরও বেশি পুনরুদ্ধার হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে এবং সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবুও, এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি এখনো নাজুক। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আস্থায় চিড়, শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত বছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা রয়েছে।
এমন এক বাস্তবতায় রাজনৈতিক স্বচ্ছতা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় নির্ণায়ক হিসেবে দেখা দিয়েছে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মনোজগতে চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসায় সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটতে শুরু করে। তাঁকে ঘিরে ব্যবসায়ীসহ দেশবাসীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। এটি মধ্য মেয়াদে অর্থনীতির জন্য একটি গঠনমূলক বা ইতিবাচকই বলা যায়। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
এদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে। ভালো ভালো অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে তলানিতে ঠেকেছে। আঞ্চলিক শেয়ারবাজারগুলোর উত্থান সত্ত্বেও আমাদের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এই পশ্চাৎপদতা মূলত কাঠামোগত। দীর্ঘদিন ধরে ভালো মানের কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা, ফিক্সড ইনকাম বা সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব বাজারে তারল্য সংকট ও আস্থার ঘাটতিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রিজার্ভের উন্নতি এবং রাজনৈতিক উত্তরণ পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সংকীর্ণ কিন্তু অর্থবহ সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেয়ারবাজারের টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি। তার জন্য কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বাজার উন্নয়নের পথ সুগম করতে হবে।
ভালো কোম্পানি যাতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় সে জন্য কোম্পানিগুলোকে রাজস্ব নীতির মাধ্যমে উৎসাহিত করা- এখন সময়ের দাবি। তালিকাভুক্ত এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান ১০ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি, করমুক্ত লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড আয় জনগণকে শেয়ারবাজারমুখী করবে। বাজারে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে, বাজারের গভীরতাও তত বাড়বে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কারও সমানভাবে জরুরি।
একটি সুশৃঙ্খল বাজারের জন্য ডিজিটাল আর্থিক রিপোর্টিং, ভালো কোম্পানি বাজারে আনার পথ সহজ করার মাধ্যমে বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। এতে ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমবে। অন্যদিকে শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকেও শক্তিশালী করতে হবে। যাতে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে বাজারে তদারকি জোরদার করা যায়। সেটি হলে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বাড়বে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সংস্কার। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কার্যকারিতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। এ ছাড়া, আন্তসংস্থা সমন্বয় এবং উন্নত আর্থিক সাক্ষরতা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে প্রণোদনা এবং সঞ্চয়পত্রের সুদহারের যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে, তাতে বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়বে।
পুঁজিবাজারের টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ভিত্তি তৈরির ওপর। তার জন্য জরুরি মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশ। পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডের অংশগ্রহণ যত বাড়বে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতিও তৈরি হবে। তাতে বাজারে অস্থিরতা কমবে; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার দেশটির জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। পুঁজিবাজারকে যদি মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়, তবে এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক নীতিসহায়তা। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কর রেয়াত সুবিধা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মিউচুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত রাখা এবং আইপিওতে মিউচুয়াল ফান্ডের কোটা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হলে তাতে খাতটি বড় হবে। এ ছাড়া বেমেয়াদি ও মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশের সীমা তুলে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এই সীমাবদ্ধতা প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি এই সংস্কারগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের পুঁজিবাজারও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিতে পরিণত হবে।
লেখক পরিচিতি: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট