স্নেহাশীষ বড়ুয়া
স্নেহাশীষ বড়ুয়া

অভিমত

আগেভাগে কর দিলে করছাড় পাওয়া যাবে না, নিয়মের মারপ্যাঁচে এক অদ্ভুত হিসাব

সময়মতো এবং আগেভাগে কর দেওয়া ভালো নাগরিকের লক্ষণ—এত দিন আমরা এটাই জেনে এসেছি। কিন্তু নতুন অর্থ আইনে এমন একটি নিয়ম এসেছে, যা দেখে মনে হতে পারে, নিয়ম মেনে ঠিক সময়ে কর দিলে কোনো লাভ নেই; বরং নিয়ম না মেনে কর বাকি রাখলেই যেন লাভ বেশি!

চলতি বছর করদাতাদের উৎসাহিত করতে সরকার ঘোষণা করেছে, কেউ যদি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেন, তবে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় পাবেন। কথাটা শুনতে দারুণ মনে হলেও এর ভেতরে একটি মারপ্যাঁচ রয়েছে।

আইনে বলা হয়েছে, এই ছাড় দেওয়া হবে রিটার্ন জমার সময় যে কর দেওয়া বাকি আছে বা ট্যাক্স পেয়েবল, তার ওপর। অর্থাৎ মোট কর থেকে আয়বর্ষে নানা সময়ে কেটে নেওয়া উৎসে কর বা জমা দেওয়া অগ্রিম কর সমন্বয়ের পর যে কর পরিশোধ করতে হবে, তার ওপর। সোজা কথায়, পুরো বছরে আপনার মোট করের ওপর নয়।

এর ফলে যা দাঁড়িয়েছে, যাঁরা সারা বছর নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করেছেন, তাঁরা এই ছাড় থেকে শূন্য হাতে ফিরতে পারেন। আর যাঁরা সঠিকভাবে কর দেননি, তাঁরা করছাড় পেতে পারেন।

বিষয়টি খুব সহজভাবে বোঝার জন্য দুজন মানুষের বাস্তব উদাহরণ দেখা যাক।

দুই বন্ধু ও দুই অফিসের গল্প। দুজনেরই বাৎসরিক আয় ১২ লাখ টাকা এবং বছর শেষে দুজনেরই মোট আয়করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার টাকা। তাঁরা দুজনই সরকারের নতুন এই ছাড় পেতে ৩০ সেপ্টেম্বরের আগেই রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে কী ঘটে দেখুন।

প্রথমে আরিফ, যিনি কাজ করেন একটি সুপরিচিত কোম্পানিতে। এই কোম্পানি আইনের প্রতি পুরোপুরি শ্রদ্ধাশীল। তাই তারা প্রতি মাসে আরিফের বেতন থেকে নির্দিষ্ট হারে কর (উৎসে কর) কেটে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দিয়েছে। বছর শেষে আরিফের পুরো ৪৫ হাজার টাকাই আগেভাগে পরিশোধ হয়ে গেছে।

এখন আরিফ যখন ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে রিটার্ন জমা দিতে গেলেন, তখন হিসাবে দেখা গেল, সরকারের কাছে তার নতুন করে আর কোনো কর বকেয়া নেই (বকেয়া কর = ০ টাকা)। যেহেতু নতুন নিয়মে এই ছাড় হিসাব হয় বকেয়া করের ওপর, তাই শূন্য টাকার ওপর আরিফ কোনো ছাড় পাননি। তিনি কোনো ছাড়ই পেলেন না।

এবার দেখি তানভীরের ক্ষেত্রে কী হয়। তানভীর কাজ করেন এমন একটি প্রতিষ্ঠানে, যারা করের এই নিয়মগুলো ঠিকমতো মানেনি। তারা তানভীরের বেতন থেকে সারা বছরে এক পয়সাও কর কাটেনি।

এখন রিটার্ন জমার সময় তানভীরের হিসাবে দেখা গেল, তাঁর পুরো ৪৫ হাজার টাকাই সরকারকে দেওয়া বাকি আছে। যেহেতু তাঁর পুরো টাকাই বকেয়া, তাই তিনি ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে রিটার্ন জমা দেওয়ায় বকেয়া টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ২ হাজার ২৫০ টাকা করছাড় পেয়ে গেলেন! তানভীরকে শেষ পর্যন্ত সরকারকে কর দিতে হলো ৪২ হাজার ৫০০ টাকা।

তাহলে আইন মানার এই পুরস্কার?

একই পরিমাণ আয় করে এবং একই দিনে রিটার্ন জমা দিয়েও তানভীর ২ হাজার ২৫০ টাকা বাঁচিয়ে ফেললেন আর আরিফ নিয়ম মেনে সব কর আগেভাগে পরিশোধ করে এক টাকাও সুবিধা পেলেন না।

একই ঘটনা ঘটছে তাঁদের ক্ষেত্রেও, যাঁরা সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে আইন মেনে সারা বছর অগ্রিম কর দিয়ে রেখেছেন। বছর শেষে তাঁদেরও আর কর বকেয়া থাকে না, ফলে তাঁরাও কোনো ছাড় পাচ্ছেন না।

সাধারণ মানুষের কাছে এটি একেবারেই অন্যায় মনে হচ্ছে। নিয়ম মেনে চললে যেখানে মানুষকে পুরস্কৃত করার কথা, সেখানে এই নিয়মের কারণে সৎ করদাতারা উল্টো বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া এখন কর্মচারীরা কোম্পানিদের চাপ প্রয়োগ করবেন, যাতে বেতনের ওপর সম্পূর্ণ উৎসে কর কর্তন না করা হয়।

এতে ক্ষতি সরকারের; কারণ, আগাম কর পেলে সরকার চালাতে যে অর্থের ঘাটতি হয়, তা মেটাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংক বা অন্য উৎস থেকে সুদে ধার করে এবং সুদ ব্যয় বাবদ অতিরিক্ত খরচ করে। আর লাভ তাঁর, যিনি নিয়ম মেনে কর দিলেন না। এ ব্যবস্থা খোদ সরকারই করে দিয়েছে।

এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ। এই ছাড়টি ‘বকেয়া করের’ ওপর না দিয়ে একজন মানুষের সারা বছরের ‘মোট করের’ ওপর হিসাব করা। তাহলে আরিফ ও তানভীর—উভয়েই সমানভাবে ২ হাজার ২৫০ টাকার সুবিধা পেতেন এবং করদাতাদের মনে কোনো ক্ষোভ জন্মাত না।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস