
সরকার পরিবর্তনের পর অনেক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেটা পূরণ হলো না। আগে সরকার বা সংস্থার পক্ষ থেকে মানুষকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন মানুষ কথা বলছে, কিন্তু নানাভাবে তাদের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নির্ভয়ে কেউ কথা বলতে পারছে না। তবে রাজনীতিতে তারুণ্যের পদচারণ একটা ইতিবাচক দিক। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির পতনও ঠেকানো গেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) আয়োজনে শনিবার অনুষ্ঠিত ‘ইন্টেরিম ব্যালান্সশিট’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়াল সংলাপে এ কথা উঠে এসেছে। পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে নির্ধারিত আলোচক ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদ এবং কলামলেখক তাসনিম তায়েব।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের যা প্রত্যাশা ছিল এবং দেড় বছরে এ সরকার যা করেছে, তার মূল্যায়ন করাই ছিল এ সংলাপ আয়োজনের উদ্দেশ্য বলে জানানো হয় সংলাপে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, ‘সমাজে দীর্ঘ বছর ধরেই বিভাজন ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভেবেছিলাম এ বিভাজন কমবে এবং খোলামনে বিতর্ক করে সহাবস্থানে যেতে পারবে মানুষ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে এগোতে পারেনি।’ তিনি বলেন, আগে সরকার বা সংস্থার পক্ষ থেকে মানুষকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন মানুষ কথা বলছে, কিন্তু নানাভাবে তাদের ট্যাগিং করা হচ্ছে। অর্থাৎ নির্ভয়ে কেউ কথা বলতে পারছে না। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী ও ছায়ানটে আক্রমণ হলো। অনেকে কথা বলেছে ঝুঁকি নিয়েই।
রওনক জাহান আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কম। বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন—এ তিন বড় কাজের কথা বলা হয়েছিল শুরুর দিকে। যেহেতু দেশে অনেক বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে, ফলে আগামী নির্বাচনটা যাতে ভালোভাবে করা যায়, সেদিকে তাঁরা মনোযোগ দিতে পারতেন। কিন্তু দেননি। বোঝাই যাচ্ছিল সংবিধান সংস্কারের মতো বিষয়ে সবাই একমত হবে না। এত বিশাল কর্মযজ্ঞে না গিয়ে কম কাজে নজর দিলে বিতর্ক কম হতো। এই রাষ্ট৶বিজ্ঞানী বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের যতই গালাগালি করি না কেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাছেই আসতে হচ্ছে। এক–এগারোর সরকারও “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি” করে রাজনীতিবিদদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে গেল।’ রওনক জাহান বলেন, খারাপ রাজনীতিকে দূর করবে ভালো রাজনীতি—এ ব্যাপারে আশা করা যায়।
পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আগে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ভয় দেখানো হতো। এখন তা দেখাচ্ছে সামাজিক শক্তি। আগে কথা বলতে না পারার একটা বিষয় ছিল। এখন সেলফ সেন্সরশিপ (স্ব–আরোপিত নিয়ন্ত্রণ) তৈরি হয়েছে। দুটোই খারাপ। তিনি বলেন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। অন্যদিকে বিকেন্দ্রীকরণের বদলে হয়েছে কেন্দ্রীভূত এবং তা দ্বিগুণ তেজি হয়েছে। এটা বেশ উদ্বেগের বিষয়।
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্বে এলেও অন্তর্বর্তী সরকার কেন ব্যর্থ হলো এবং এর পেছনের কারণ কী, এ ব্যাপারে প্রশ্ন রাখেন হোসেন জিল্লুর। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা বিচ্ছিন্ন অভিজাতসুলভ প্রবণতায় ভুগেছেন কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বিইআই সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আঞ্চলিক অস্থিরতা দেখা গেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহারে ভূরাজনীতি নিয়ে কথা এসেছে কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু দেখা যায়নি। ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে এ বছরে। নবায়ন করতে হবে, যা আগামী সরকারকে করতে হবে। অন্যদিকে বাণিজ্য বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়া বড় বিপদে ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এসে শুরুতেই বলেছেন চীনের সঙ্গে যেন বেশি ঘনিষ্ঠ না হয় বাংলাদেশ। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ছে, আরও বাড়বে। তিনি বলেন, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশকে সক্রিয় হতে দেখা গেছে। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) হয়েছে। এটা সাহসী পদক্ষেপ।
হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো তৈরি করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, এসব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে খুব বেশি সমন্বয় দেখা যায়নি। একটা জিনিস অবশ্য দেখা গেছে, সেটা হচ্ছে রাজনীতিতে তারুণ্যের পদচারণ। এটা একটা ইতিবাচক দিক। এটা নতুন সংস্কৃতি, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখা গেছে। হয়তো তাদের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল। কারণ, ভালো পরামর্শ তারা পায়নি। তবে চার কোটি তরুণের ৯০ শতাংশই ভোট দেবেন আগামী নির্বাচনে। তাঁদের অনেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। ছয় মাসের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। শিক্ষিত বেকার বেড়ে গেছে। ব্যবসার খরচও বেড়ে গেছে, নগদ সহায়তা গেছে কমে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে লুৎফে সিদ্দিকীকে দেখিয়ে দিয়েছেন; তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে দেখা গেছে, তিনি সবকিছু বুঝে ফেলেছেন, পরে আর কথা বলতেই আগ্রহী হননি তিনি। আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, উপদেষ্টারা নিজেদের বেশি জ্ঞানী ও সবজান্তা মনে করেছেন। আর আমলাদের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা জানেন না যে সিদ্ধান্তের ওপর কী প্রভাব পড়বে। এভাবেই চলেছে দেড়টা বছর।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর অনেক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।...আমরা কী দেখলাম? আগে যে পদায়ন, পদোন্নতি রাজনৈতিকভাবে করা হয়েছিল, তার ব্যতিক্রম নেই। আশা ছিল মেধা ও নৈতিকতাভিত্তিক হবে পদায়ন, পদোন্নতি এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। দেখলাম আগের মতোই সবকিছু হলো। আশা পূরণ হলো না।’
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ২০২৪ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিক বিবেচনায় নিলে কোথাও অর্থনীতি ছিল না। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির পতন ঠেকানো গেছে। রিজার্ভ বেড়েছে, প্রবাসী আয় বেড়েছে, কয়েকটি ব্যাংককে এক করা হয়েছে। শিল্প এলাকায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সমস্যা হয়েছিল। সেগুলো পরে সামাল দেওয়া গেছে। রপ্তানিও ভালো ছিল। যদিও গত কয়েক মাসে তা অবনতির দিকে। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের বেশি ছিল। এখন সেটা সাড়ে ৮ শতাংশ নেমে এসেছে।
মামুন রশীদ আরও বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিশেষ কিছু অন্তর্বর্তী সরকার দেখাতে পারেনি। বরং নীতি পদক্ষেপে স্বার্থের সংঘাত দেখা গেছে। তদবির এবং আত্মীয়স্বজনকে সহায়তা করতে দেখা গেছে। এ সময়ে আমলাতন্ত্র সব সময় সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। উদাহরণস্বরূপ যদি বলা যায়, এডিপির ৪২ শতাংশ খরচ করা হয়েছে একটি বিশেষ অঞ্চলে।
কলাম লেখক তাসনিম তায়েব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে এসেছেন তরুণেরা। তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে এসেছেন। কিন্তু দেখা গেছে, তাঁরা যথাযথ পরামর্শ পাননি। যেভাবে তাঁদের কাজে লাগানো যেত, সেভাবে কাজে লাগানো যায়নি। উল্টো নানা ধরনের দল ও গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।