রাজধানীর পান্থপথের সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ার ভবন। এই ভবনের একটিতে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর আর অন্য ভবন ভাড়া দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে ব্যাংকটি
রাজধানীর পান্থপথের সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্মাণাধীন টুইন টাওয়ার ভবন। এই ভবনের একটিতে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর আর অন্য ভবন ভাড়া দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে ব্যাংকটি

সংকট মোকাবিলা

সংকট কাটাতে টুইন টাওয়ারের একটি ভবন ভাড়া দেবে ন্যাশনাল ব্যাংক

  • ব্যাংক কোম্পানি আইনে ভবন ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বিশেষ ক্ষমতায় অনুমতি প্রদান।

  • ব্যাংকটির ৫৬.৪৪% ঋণ খেলাপি, যা পরিমাণে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।

আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক তাদের নির্মাণাধীন ‘টুইন টাওয়ারের’ একটি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়ার বিশেষ সুযোগ পেয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়ে নির্মাণাধীন দুটি ভবনের একটিতে হবে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়। অন্যটি ভাড়া দিয়ে আয় করতে চায় ব্যাংকটি। এই আয় ব্যাংকের আর্থিক সংকট কাটাতে কিছুটা সহায়তা করবে বলে আশা কর্মকর্তাদের।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ক্ষমতাবলে ন্যাশনাল ব্যাংককে এ সুযোগ দিয়েছে।

দেশে এর আগে অন্য কোনো ব্যাংককে এভাবে ভবন ভাড়া দিয়ে আয় করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক ভবন ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করতে পারে না। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংক সংকটে থাকায় সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যাংকটিকে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পান্থপথের সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে ৬৪ কাঠা জমির ওপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ‘টুইন টাওয়ার’ ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। দুটি ১২তলা ভবনের মোট ফ্লোর স্পেস ৩ লাখ ৫৫ হাজার বর্গফুট। ভবন দুটির অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে টাওয়ার-১ ব্যবহারের উপযোগী করার কাজ চলছে। সেখানে শিগগির ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন হবে—এমন সাইনবোর্ডও ঝুলছে। অন্যদিকে টাওয়ার-২-এর কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।

ভবন দুটির নির্মাণের ব্যয় ইতিমধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর একটি ভবনে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় করার পাশাপাশি অন্যটিতে আবাসিক হোটেল করার প্রস্তাব দিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবাসিক হোটেল নির্মাণের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।

এ নিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) গতকাল শনিবার ফোন করা হলেও তাঁরা কেউই সাড়া দেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে মাঝেমধ্যে টাকা ধার চায় ব্যাংকটি। এ জন্য আইনের ধারা শিথিল করে ভবন ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ভবনটি কেন গলার কাঁটা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন আসে। ব্যাংকটির পুরো কর্তৃত্ব চলে যায় সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের কাছে। এরপর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়স্বজন ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যাংকটির পর্ষদে যুক্ত করে ২০২৪ সালের আগপর্যন্ত ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণে ছিল সিকদার পরিবার। তাতে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। এখনো পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি।

ন্যাশনাল ব্যাংকের টুইন টাওয়ার নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালের জুনে পাইলিংয়ের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকে। তখন পাশের সুন্দরবন হোটেলের সীমানাপ্রাচীর, নিরাপত্তাকর্মীদের একটি কক্ষ ও হোটেলটির ভেতরের রাস্তার কিছু অংশ পাইলিংয়ের গর্তে ধসে পড়ে। পরে দফায় দফায় খরচ সংশোধন করে কাজ চলতে থাকে।

এদিকে ন্যাশনাল ব্যাংককে প্রধান কার্যালয়ের জন্য প্রতি মাসে উচ্চ ভাড়া দিতে হচ্ছে। সিকদার গ্রুপের মালিকানাধীন ভবনে শুধু প্রধান কার্যালয়ের ভাড়া বাবদ ব্যাংকের খরচ হচ্ছে আড়াই কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায় গ্রুপটি। এরপর নতুন পর্ষদ টুইন টাওয়ারের টাওয়ার-১-এ প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক যা বলেছে

টুইন টাওয়ারের একটি ভবন শুধু নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করার চেয়ে ভাড়া দিয়ে আয় করা আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক—এমন যুক্তিতে ভবন ভাড়া দিয়ে আয় ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর অনুমতি চায় ন্যাশনাল ব্যাংক।

ব্যাংক কোম্পানি আইনে ভবন ভাড়া দিয়ে আয় করার সুযোগ না থাকায় ন্যাশনাল ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্ট ধারা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে গত ২৯ জুন সরকারকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের সম্মতি পাওয়ার পর প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকটিকে এ সুযোগ দেওয়া হয়।

বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের দেওয়া মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যা পরিমাণে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে এবং এখনো লোকসানে রয়েছে।