
বর্তমানে ৪০০টি উপশাখা এবং ৬২৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আপনাদের ব্যাংকে উপশাখা ও এজেন্ট মডেলের মাধ্যমে দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পেছনের কৌশলটি কী?
মো. তৌহিদুল আলম খান: আমাদের মূল দর্শন হচ্ছে ব্যাংকিং সেবা গ্রাহকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। গ্রাহককে সব সময় ব্যাংকের কাছে আসতে হবে—এমন নয়। সেই চিন্তা থেকেই শাখার পাশাপাশি উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংকে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। এ জন্য আমরা ব্যয়সাশ্রয়ী ও সময়োপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার করছি।
বর্তমানে আমাদের শাখার সংখ্যা ১০৯। সেই তুলনায় উপশাখা ও এজেন্ট পয়েন্টের সংখ্যা অনেক বেশি। বর্তমানে ৪০০টি উপশাখা এবং ৬২৩টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনতে পারছি।
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের মধ্যে আপনাদের সবচেয়ে বড় সফলতা ক্ষুদ্রঋণ ডিজিটাল প্রক্রিয়া ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে সফল হলেন?
মো. তৌহিদুল আলম খান: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য বড় ঋণের কাঠামো সব সময় কার্যকর নয়। তাই আমরা সহযোগিতামূলক ও সম্পর্কভিত্তিক ব্যাংকিং, ছোট অঙ্কের ঋণ এবং উদ্যোক্তার ব্যবসার প্রকৃতি বোঝার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। বিশেষ করে নারী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ তৈরি করছি।
সে ক্ষেত্রে এনআরবিসি ব্যাংকের দক্ষ ও অভিজ্ঞ তথ্যপ্রযুক্তি দলের নিজস্ব উদ্ভাবনী এলপিএসের (লোন প্রসেসিং সিস্টেম) মাধ্যমে ঋণ আবেদন গ্রহণের পর থেকে বিতরণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো—এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ উদ্যোক্তাকে ঋণ প্রদান করেছি। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।
আমাদের মূল দর্শন হচ্ছে ব্যাংকিং সেবা গ্রাহকের কাছে নিয়ে যাওয়া। গ্রাহককে সব সময় ব্যাংকের কাছে আসতে হবে, এমন নয়।মো. তৌহিদুল আলম খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এনআরবিসি ব্যাংক
প্রান্তিক পর্যায়ে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর পাশাপাশি সম্পদের নিরাপত্তা বা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
মো. তৌহিদুল আলম খান: ব্যাংকিংয়ে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পদের মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখন প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান, পুনরুদ্ধার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
২০২৬ সালের আমাদের কৌশলে খেলাপি ঋণ কমানো, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নজরদারির বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও ডিজিটাল প্রক্রিয়া ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছি।
সরকারি মাশুল ও রাজস্ব সংগ্রহের কাজে যুক্ত হয়ে ব্যাংক কীভাবে নন-ফান্ডেড ইনকাম বাড়াতে সক্ষমতা অর্জন করেছে?
মো. তৌহিদুল আলম খান: সরকারি রাজস্ব ও বিভিন্ন মাশুল সংগ্রহ আমাদের জন্য শুধু ব্যবসার বিষয় নয়, এটি গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ।
আমাদের শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ও বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে কর, ভ্যাট, পাসপোর্ট ফি, বিআরটিএ ফি এবং বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল সংগ্রহ করছি।
এসব সেবা প্রদানের মাধ্যমে লেনদেন বাড়ে, নতুন গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং ফি-ভিত্তিক আয়ের সুযোগও তৈরি হয়। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা সব সময় ব্যবসাকে প্রাধান্য না দিয়ে জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে আপনাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ কী?
মো. তৌহিদুল আলম খান: রেমিট্যান্সকে আমরা ব্যাংকের অন্যতম কৌশলগত সেবা হিসেবে দেখি। দ্রুত, নিরাপদ ও সহজে প্রবাসী আয় পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য দেশব্যাপী শাখা ও উপশাখায় রেমিট্যান্স সেবা জোরদার করেছি এবং বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রে বিশেষ রেমিট্যান্স ডেস্ক চালু করেছি। সম্প্রতি বিকাশের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রবাসীরা এনআরবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশে বিকাশ হিসাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া প্রবাসফেরত এবং প্রবাসীদের স্বজনদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের বিভিন্ন আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে আমরা ‘প্রবাস বন্ধু’ নামে ঋণ প্রকল্প চালু রেখেছি।
প্রান্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আগামীর ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ায় এনআরবিসি ব্যাংক কীভাবে পরিকল্পনা করছে?
মো. তৌহিদুল আলম খান: ক্যাশলেস অর্থনীতি এখন কোনো স্লোগান বা স্বপ্ন নয়, এটি প্রয়োজন। বৈশ্বিক প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন কাঠামোতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ক্যাশলেস (নগদবিহীন) লেনদেন অভ্যস্ত করার বিকল্প কিছু নেই। ক্যাশলেস অর্থনীতি শুধু বড় শহরের ডিজিটাল লেনদেন দিয়ে তৈরি হবে না; এর ভিত্তি তৈরি হবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে।
‘এক দেশ এক কিউআর, লেনদেনে বাংলা কিউআর’—বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কার্যক্রমকে আমরা সারা দেশে একযোগে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। কিউআর পেমেন্টের মাধ্যমে একজন ছোট ব্যবসায়ী যেমন সহজে অর্থ গ্রহণ করতে পারছেন, তেমনি তাঁর লেনদেনের একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এই তথ্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা ও ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করতে চাই, দেশে প্রথম চেক ও এটিএম কার্ড ছাড়াই কিউআরের মাধ্যমে শাখা ও উপশাখার ক্যাশ কাউন্টার থেকে টাকা উত্তোলন সুবিধা চালু করে এনআরবিসি ব্যাংক।
আমাদের লক্ষ্য হলো, প্রযুক্তি, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকিং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।