ক্রেডিট কার্ড
ক্রেডিট কার্ড

ব্যবসা ও শিক্ষা প্রসারে ক্রেডিট কার্ড

ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে মানুষের মানিব্যাগের চেহারা বদলে গেছে। কাগজের নোটের জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিকের কার্ড। একসময় ক্রেডিট কার্ড মানেই ছিল কেবল উচ্চবিত্তের বিদেশ ভ্রমণ কিংবা শৌখিন কেনাকাটার মাধ্যম। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষে সেই ধারণা এখন সেকেলে। অনলাইনে পছন্দের খাবার অর্ডার করা থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন, কিংবা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি জমা দেওয়া—সবখানেই এখন ক্রেডিট কার্ড এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় ঋণের সীমা বৃদ্ধি এবং করপোরেট ও স্টুডেন্ট কার্ডের বিশেষায়িত সুবিধা এই খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

দৈনন্দিন জীবন ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার

আজকাল ক্রেডিট কার্ড কেবল কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা থাকায় ফেসবুক-ইউটিউবে বুস্টিং কিংবা বিদেশি সফটওয়্যার কেনা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে দিচ্ছে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট, ক্যাশব্যাক ও প্রোমোশনাল অফার। বিশেষ করে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বিমান টিকিট কেনায় বিশেষ ছাড়, রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধা কার্ডের চাহিদাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে কেবল ব্র্যাক ব্যাংকেই প্রায় তিন লাখ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক রয়েছেন। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) ও আইএফআইসি ব্যাংকের ভিসা সিগনেচারসহ বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের কার্ডগুলো গ্রাহকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে।

করপোরেট কার্ড: ব্যবসার নতুন গতিপথ

ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে ‘করপোরেট ক্রেডিট কার্ড’ এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম পছন্দ। এই কার্ড সাধারণত কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে ইস্যু করা হয় এবং এর দায়ভার কোম্পানির ওপরই থাকে।

করপোরেট কার্ডের মূল সুবিধাগুলো হলো—

ক্যাশ ফ্লো ব্যবস্থাপনা: কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন করলে প্রায় ৫০ দিনের একটি ‘ক্রেডিট পিরিয়ড’ পাওয়া যায়। ফলে কোম্পানি তাৎক্ষণিক নগদ টাকা খরচ না করে নির্দিষ্ট সময় পর বিল পরিশোধ করতে পারে, যা আর্থিক পরিকল্পনাকে সুসংগঠিত করে।

ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি বিভাগের জন্য ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এতে অপ্রয়োজনীয় বা অনুমোদনহীন ব্যয়ের সুযোগ কমে।

স্বচ্ছতা ও অডিট: প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড থাকায় ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং ও অডিট করা অনেক সহজ হয়। এ ছাড়া বিজনেস ট্রাভেলের জন্য নির্ধারিত ট্রাভেল কোটা (এন্ডোর্সমেন্ট) সুবিধা ব্যবসায়িক ভ্রমণকে করে তোলে ঝামেলামুক্ত।

শিক্ষার সারথি: স্টুডেন্ট কার্ড

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার নাম ছিল সঠিক সময়ে টিউশন ফি বা হোস্টেল পেমেন্ট নিশ্চিত করা। স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর করেছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক শিক্ষার্থীদের বিশেষ কার্ড সুবিধা দিচ্ছে।

স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড মূলত শিক্ষার্থীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে যুক্ত করে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে পড়াশোনার টিউশন ফি, অ্যাপ্লিকেশন ফি, ভিসা প্রসেসিং ও হোস্টেল পেমেন্ট সহজে নিশ্চত করা সম্ভব হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা সার্ভিসে অনলাইন লেনদেনে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ছাত্রদের এই সেবা
দিয়ে আসছে।

ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মাহীয়ুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আর্থিক লেনদেন সহজ করতে আমরা শিগগিরই বিশেষায়িত ক্রেডিট কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৈদেশিক মুদ্রায় অনলাইনে কেনাকাটা, আন্তর্জাতিক পরীক্ষার ফি পরিশোধ এবং বিদেশের মাটিতে পেমেন্ট দিতে পারবে। বর্তমানে অভিভাবকের জমার বিপরীতে সাপ্লিমেন্টারি কার্ড দেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তা আরও সহজ করার পথে হাঁটছে ব্যাংকগুলো।’

ঋণের সীমা এখন দ্বিগুণ

ক্রেডিট কার্ডের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নীতিমালায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আগে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে জামানতহীন ঋণের সীমা ছিল ১০ লাখ টাকা, যা এখন বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া জামানতের বিপরীতে ঋণের সীমা ২৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

নতুন নীতিমালার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখন থেকে কার্ডধারীরা তাঁদের মোট ক্রেডিট সীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। এটি জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে গ্রাহকদের জন্য এক বিশাল বড় প্রাপ্তি।

সিটি ব্যাংক পিএলসির হেড অব কার্ডস তৌহিদুল আলম বলেন, ‘আমরা প্রিমিয়াম সেগমেন্টের গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট লিমিট দিচ্ছি, যা ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। এ ছাড়া সাপ্লিমেন্টারি কার্ডহোল্ডারদের জন্য ১৬ বছর বয়সের সীমা নির্ধারণ করায় নতুন প্রজন্মকে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’ 

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মকর্তার মুখেও একই কথা। মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তের কারণে ব্যাংকগুলোর একটি বাধা দূর হয়েছে। আমাদের অনেক গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্টের চাহিদা বেশি। তারা ঋণসীমা বাড়ানোর অনুরোধ করতেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা থাকায় আমরা তা করতে পারতাম না। এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে আমরা এখন গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আরও উন্নত সেবা দিতে পারব।’

কো-ব্র্যান্ডেড কার্ড ও লাইফস্টাইল সুবিধা

বর্তমানে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘কো-ব্র্যান্ডেড’ কার্ড ইস্যু করছে। যেমন কোনো নির্দিষ্ট চেইন শপ বা এয়ারলাইনসের সঙ্গে পার্টনারশিপে তৈরি কার্ড ব্যবহার করলে ওই ব্র্যান্ডে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিসকাউন্ট বা লয়্যালটি পয়েন্ট পাওয়া যায়। এটি গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী কেনাকাটার এক অনন্য সুযোগ।

সতর্ক ব্যবহারের পরামর্শ

সুবিধা যত বেশি, দায়িত্বও তত বড়। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি:

নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ: সুদবিহীন সুবিধার পূর্ণ স্বাদ নিতে হলে বিলের তারিখ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

লুকানো চার্জ সম্পর্কে জানা: কার্ড নেওয়ার আগেই ‘শিডিউল অব চার্জেস’ ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত।

নিরাপত্তা: পিন কোড বা ওটিপি কখনোই কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।