
এফবিসিসিআইসহ অন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে পেশাদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের (পুতুল) মতো আচরণ করছে।’
এ নিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, যখন ৬ থেকে ৯ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তালি দিয়েছিল। অর্থ পাচারের সময়েও তারা চুপ ছিল। এমন আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ব্যাংকিং খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এ নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আহসান এইচ মনসুর এই মন্তব্য করেন।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) এ সভার আয়োজন করে। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁরা সবাই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ একই সঙ্গে হতে হবে। অর্থনীতির উন্নয়নের জন্যই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হওয়ার প্রয়োজন। ছোট সুবিধার জন্য আমরা বড় সুবিধা হাতছাড়া করতে পারি না।’
আইসিসি বাংলাদেশের সহসভাপতি ও হা–মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান একে আজাদ বলেন, ‘মুদ্রানীতি সংকোচনশীল করায় সুদহার বেড়ে গেছে। এতে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। সামনে ৬ মাসে আরও ১২ লাখ চাকরি হারাবেন। দেশে বিনিয়োগ নেই, রাজস্ব আদায় কমে গেছে। এই মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতি ঠিক রাখা যাবে না। এলডিসি নিয়ে বর্তমান সরকারকে এত বোঝানো হলো কিন্তু তারা শুনল না। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আমাদের প্রধান কাজ হবে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা। কারণ, সরকার দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু বুঝে উঠতে সময় লাগবে।’
পরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুদহার বাংলাদেশে বেশি, এটা আমিও স্বীকার করি। তবে এটা মানতে হবে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছিল, তা বেড়ে ১১ শতাংশে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে সুদের হারে। সুশাসন, তদারকি ও গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদহার কমে আসবে। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। তখন মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে।’
এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি মৌলিক বিষয় উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, এটা আজ বা কাল ঘটবেই। বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। কারণ, জিডিপিসহ উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশগুলোর সমপর্যায়ে নেই এবং এই গ্রুপে থাকা আমাদের জন্য কোনো সম্মানের বিষয় নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের সারিতে গিয়ে বৈশ্বিক সম্মান অর্জন করা।’
ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে বলে উল্লেখ করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এ জন্য আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো আইন সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্ডার সংশোধন চার মাস আগে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। দুঃখজনক যে এটা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে এটার অনুমোদন হওয়া দরকার।
আইসিসি বাংলাদেশের ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য দেন এবং অধিবেশন পরিচালনা করেন।
গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমান, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদ, পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম।
আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এবং আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়।