রাষ্ট্রমালিকানাধীন রূপালী ব্যাংক ঋণের বিপরীতে যে সুদ আয় করেছে, তার দ্বিগুণের বেশি সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে আমানতকারীদের। বিনিয়োগ তথা সুদ ও কমিশন আয় থেকে এই সুদ পরিশোধ করেছে ব্যাংকটি। তবে বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে (জানুয়ারি-জুন) এই ব্যাংক ৬৪০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। উচ্চ খেলাপির কারণে সুদ আয় কমে ব্যাংকটির এমন হাল হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে ব্যাংকটি ১০ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রকাশিত ব্যাংকটির চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত বুধবার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় আর্থিক প্রতিবেদনটি অনুমোদিত হয়।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে রূপালী ব্যাংক ঋণের বিপরীতে ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা আয় করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এদিকে আমানতকারী ও ধারের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ একদিকে ব্যাংকটির সুদ আয় কমেছে, অন্যদিকে সুদ পরিশোধ বেড়েছে। এতে প্রকৃত সুদ আয় তো হয়ইনি, বরং লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। গত বছরে এই সময়ে লোকসান হয়েছিল ৫৯৪ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করা হয়নি। অনেক খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে আয় করা হয়েছে। আমরা পুরোপুরি নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করছি। এ জন্য খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। আমরা ছোট, মাঝারি ও ভোক্তা ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ছাড়া বড় ঋণ হলে খুবই বেছে বেছে দেওয়া হচ্ছে।’
আগে নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করা হয়নি। অনেক খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে আয় করা হয়েছে। আমরা পুরোপুরি নিয়ম মেনে ব্যাংকিং করছি। এ জন্য খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। আমরা ছোট, মাঝারি ও ভোক্তা ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ছাড়া বড় ঋণ হলে খুবই বেছে বেছে দেওয়া হচ্ছে।কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম, এমডি, রূপালী ব্যাংক।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে রূপালী ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপরীতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ ব্যবসা থেকে আয় হয়েছে ১০১ কোটি টাকা। অন্যান্য আয় হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৯৭৬ কোটি টাকা। কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ ব্যবসা থেকে আয় হয়েছে ২১৫ কোটি টাকা ও অন্যান্য আয় হয়েছে ৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়লেও কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ ব্যবসা থেকে আয় কমেছে ব্যাংকটির। এদিকে বেতন–ভাতা, ভাড়াসহ নানা খরচ বেড়েছে। ফলে লোকসান হয়েছে ৬১০ কোটি টাকা। এক কোটি টাকার কম নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে ব্যাংকটি। সরকারকে কর দেওয়ার পর সব মিলিয়ে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৪০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জুনের শেষে রূপালী ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ২৮ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৭২ হাজার ৬২ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে ছিল ৫১ হাজার ২৫২ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ঋণের ৩৯ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছিল, যা জুনে কমে হয়েছে ৩৮ শতাংশ। ছয় মাসে ব্যাংকটির আর্থিক কর্মকাণ্ডের খুবই নগণ্য অগ্রগতি হয়েছে।
ডিএসইতে ব্যাংকটি জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে তাদের শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। এ সময়ে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৪০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যদিও ২০২৫ সালের একই সময়ে ব্যাংকটি ৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। এতে শেয়ারপ্রতি মুনাফার হার ছিল ২০ পয়সা। অন্যদিকে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৫ টাকা ১ পয়সা। এ সময়ে নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ২৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে ব্যাংকটি ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। গত জুনের শেষে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) হয়েছে ২২ টাকা ৪৩ পয়সা।