ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে

ইসলামী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়

ইসলামী ব্যাংকে দিনভর উত্তেজনা, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করল পুলিশ

ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গতকাল সোমবার দিনভর উত্তেজনা ছিল ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ঘিরে। সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে ব্যাংকটির কয়েক শ গ্রাহক রাজধানীর দিলকুশায় প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন শুরু করেন। শুরুতে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। পরে আবার জড়ো হয়ে প্রধান কার্যালয়ের সামনে ও ভেতরে দিনভর বিক্ষোভ করেন তাঁরা।

বিক্ষোভকারীদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে গ্রাহকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়েছে।

জানা যায়, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন। একই দিন রাত নয়টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছু কর্মকর্তা–কর্মচারীর ‘মব’–এর শিকার হয়ে ডেপুটি গভর্নর পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।

দিনভর যা হলো

সরেজমিন দেখা গেছে, গতকাল সকাল আটটা থেকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থান নেন। সকাল নয়টায় প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে প্রায় ৫০০ ব্যক্তি। তাঁরা নতুন চেয়ারম্যানকে ফ্যাসিবাদের দোসর এবং এস আলমকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার ও পাচার করা অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়ে ফেস্টুন প্রদর্শন করেন। এ ছাড়া খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করায় গভর্নরের পদত্যাগ দাবি করেন। কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর সকাল ১০টার আগেই জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাঁদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন আহত হন।

ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম জানায়, পুলিশের লাঠিপেটায় প্রায় ২৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ব্যাংকটির লোকাল শাখার গ্রাহক আতিকুর রহমান ও মিকাইল ইসলাম, আগারগাঁও শাখার গ্রাহক রেজাউল করিম, ধানমন্ডি শাখার ইকবাল হোসেন, ফার্মগেট শাখার গ্রাহক হাবিবুর রহমান ও বংশাল শাখার নূর মোহাম্মদ রয়েছেন।

মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকটির কিছু গ্রাহক সড়ক অবরোধ করেছিলেন। আমরা তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছি।’

দুপুরের দিকে আবার জড়ো হয়ে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে গ্রাহক ফোরাম।

সমাবেশে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুরুন নবি মানিক বলেন, নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি আগের এমডি ওমর ফারুককে ফিরিয়ে আনতে হবে। এস আলমকে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে হবে। এ ছাড়া খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়ায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেন তিনি।

রাতে পর্ষদের সভা

নতুন চেয়ারম্যানের যোগদান ও ব্যাংকটির এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র অনুমোদনের উদ্দেশ্যে গতকাল বেলা আড়াইটায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভা ডাকা হয়। এতে নতুন চেয়ারম্যানের সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। তবে ব্যাংকটির সামনে দিনভর আন্দোলন চলায় কোনো পরিচালক আসেননি। পরে সেই সভা বাতিল করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে অনলাইনে সভা করার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করে দেখা গেছে, ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেনকে অনলাইনে সভা করার জন্য চাপ দেন কিছু পুলিশ সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার এস এম মিজানুর রহমান, সবুজবাগ জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার জাহিদ হোসেনসহ কয়েকজন।

রাতে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পর্ষদের পাঁচজন সদস্য ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অংশ নেন।

সভায় সম্প্রতি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানের জমা দেওয়া পদত্যাগপত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হোসাইনকে দায়িত্বে বহাল রেখে ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

গ্রাহক ফোরামের নেতারা সাংবাদিকদের বলেন, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আজ মঙ্গলবার সারা দেশের সব শাখার সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের জানান, একটি রাজনৈতিক দল ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছে। কোনো ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব মেনে নেওয়া হবে না। সড়কে আন্দোলন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না।

গতকাল বিকেলে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিবৃতিতে সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা ও নবনিযুক্ত বিতর্কিত চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ গ্রাহকদের পুলিশ গুলি চালিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। পাশাপাশি পুলিশের লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ সেই সঙ্গে গ্রাহকদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কথাও জানান তিনি।

২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছিল এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিয়ন্ত্রণ হারায় গ্রুপটি। ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমেছে ১৩৭ কোটি টাকায়। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হিস্যা ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে (মার্চ ২০২৬) নেমেছে। অন্যদিকে প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তা জব্দ করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।