দেশের ব্যাংকগুলোতে যে অর্থ জমা আছে, তার ৫৬ শতাংশ ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে জমা টাকার বেশির ভাগই আপনার-আমার বা আমাদের পরিবারের। তবে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীর বড় অংশের হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ২৫ লাখ টাকার কম। ২৫ কোটি টাকার বেশি জমা আছে, দেশে এমন ব্যক্তি আছেন মাত্র ১১৮ জন। সব মিলিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৭ কোটির কিছু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের বড় অংশই বেসরকারি খাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৮৩ শতাংশই ছিল বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ ছিল ব্যক্তি আমানতকারীর। বাকি ২৭ শতাংশ বেসরকারি শিল্প, কোম্পানি, সংস্থা ও ব্যবসায়ীর। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ১৭ শতাংশ সরকারি খাতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের।
আমানত ও ঋণ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর গত বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৫৫ শতাংশ ছিল ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে। আর ১৩ শতাংশ আমানত ছিল ২ লাখ টাকার কম জমা আছে, এমন আমানতধারীদের। এ ছাড়া ১৩ শতাংশ আমানত ছিল ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা আছে, এমন আমানতধারীদের। ১১ শতাংশ আমানত ছিল ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা আছে, এমন আমানতকারীদের। আর বাকি ৮ শতাংশ আমানত ছিল যাঁদের হিসাবে ১ কোটি টাকার বেশি জমা ছিল তাঁদের।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ব্যাংকগুলোর সেবা এখন নানা উপায়ে প্রত্যন্ত এলাকায়ও পৌঁছে গেছে। কারণ, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল মাধ্যমে হিসাব খোলা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। এতে দ্রুত বাড়ছে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের পরিবারের সদস্যরা ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ কোটি ৫২ লাখ ২১ হাজার ১৯৬ হিসাব খুলেছিলেন। তখন ব্যাংকগুলোতে তাঁদের আমানতের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৯৫৫টিতে। একই সঙ্গে গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
জানতে চাইলে এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রিয়াজ খান প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিশ্রেণির আমানতই ব্যাংক খাতের আমানতের মূল চালিকা শক্তি। যে দেশের মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা যত বেশি, সেই দেশের অর্থনীতি তত উন্নত। খুচরা আমানতের সুবিধা হলো, এই আমানত হঠাৎ করে কখনো কমে যাবে না। এ জন্য ব্যাংকগুলো এই টাকার ওপর ভরসা করে ভালো বিনিয়োগ করতে পারে। ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসই আমানতের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে ছোট অঙ্কের আমানতকারীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ব্যক্তি আমানতকারীর ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ১৫ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪০৬ টি হিসাবের প্রতিটি গড় জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ টাকার কম। তাদের মোট জমা টাকার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা জমা আছে, এমন হিসবাধারীর সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ ১২ হাজার ৮১৫ জন। তাঁদের জমা আমানতের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত জমা আছে, এমন আমানতকারীর হিসাব ছিল ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২৫৫টি। আর এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা জমা আছে, এমন ব্যাংক হিসাব ছিল গত মার্চ শেষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩৪টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এক কোটি টাকা থেকে ২৫ কোটি টাকার আমানত হিসাবের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৫২৭টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৮৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর ২৫ কোটি টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা আছে, এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল ১০৩টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা আছে, এমন হিসাব ছিল গত মার্চ শেষে মাত্র ১৫টি। এসব হিসাবে জমা ছিল দেড় হাজার কোটি টাকা।
এনআরবি ব্যাংকের এমডি তারেক রিয়াজ খানের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের কারণে মানুষের সঞ্চয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন। চীনে সঞ্চয়ের হার অনেক বেশি। তাই তাদের অর্থনীতিও উন্নত। আমাদের অর্থনীতি বড় করতে হলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে। এতে সঞ্চয়ও বাড়বে।