দীর্ঘমেয়াদি আমানতের সুদ কমাচ্ছে ব্যাংকগুলো

ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানতের সুদহার কমাতে শুরু করেছে দেশের ব্যাংকগুলো। তারই অংশ হিসেবে অনেক ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি আমানতের সুদহার কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ব্যাংকে এখন দীর্ঘমেয়াদি আমানতের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি আমানতে বেশি সুদ। সাধারণত মেয়াদ যত বেশি হয়, আমানতের সুদও তত বেশি হয়। তবে এখন উল্টোটা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে ঋণের সুদহার কমানোর চাপ আছে, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে নীতি সুদহার কমিয়েছে। তাতে ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমে আসবে। এই পূর্বাভাস থেকে ব্যাংকগুলো সব ধরনের আমানতে সুদহার কমাতে শুরু করেছে।

তবে ব্যাংকগুলো বলছে, সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদ কমে আসছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কমে গেছে। তাতে অনেক ব্যাংকে বাড়তি তারল্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক ব্যাংক সুদ কমিয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধির লাগাম টানছে। কারণ, আমানতের অর্থ বিনিয়োগ করতে না পারায় তাতে ব্যাংকের সুদ বাবদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যেসব ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে এবং যেসব ব্যাংক বর্তমান পরিস্থিতি ভালো ব্যাংক হিসেবে গ্রাহকের আস্থায় রয়েছে, সেসব ব্যাংকই দীর্ঘমেয়াদি আমানতের সুদ কমিয়ে দিচ্ছে।

তবে তারল্য–সংকটে থাকা কিছু দুর্বল ব্যাংক এখনো ১১-১৩ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া আমানত ও ঋণের ৪ শতাংশ ব্যবধান (স্প্রেড) কার্যকর হচ্ছে না।

সুদ কতটা কমল

সাধারণত ঋণ ও বিনিয়োগের সুদহারের ওপর নির্ভর করে আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে ব্যাংকগুলো। কারণ, আমানত হলো ব্যাংকের দায়। আমানতের বিপরীতে নিয়মিত সুদ পরিশোধ করতে হয়। ব্যাংকগুলোর স্থায়ী আমানতের সুদহারের ওপর নির্ভর করেই সব আমানতের সুদহার নির্ধারিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতের নতুন সুদহার নির্ধারণ করেছে। ভোক্তা বা সাধারণ মানুষের ৪ মাস মেয়াদি আমানতে ব্যাংকটি আগে ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ দিয়ে আসছিল, তা কমিয়ে এখন ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। ৬ মাস মেয়াদি আমানতের সুদহার কমিয়ে করা হয়েছে ৮ শতাংশ, আগে যা ছিল ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ৭ মাস মেয়াদি আমানতে আগে সুদহার ছিল সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা কমিয়ে ৮ থেকে সোয়া ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে ৯১ দিন, ১৮১ দিন মেয়াদি আমানতে সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে দশমিক ৭৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। এসএমই ও করপোরেট আমানতেও সুদহার একই হারে কমানো হয়েছে।

আমানতের সুদহার কমিয়ে তহবিল ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। এখন সবাই গুরুত্ব দিচ্ছে ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদি আমানতে। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে সুদহার কোথায় যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি আমানতে অনেকে সুদও কম দিচ্ছে। ব্যাংকভেদে সুদহার ভিন্ন হয়।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্র্যাক ব্যাংক।

ব্র্যাক ব্যাংকও বিভিন্ন মেয়াদি আমানতের সুদহার কমিয়েছে। নতুন সুদহার ২৪ আগস্ট থেকে কার্যকরও করেছে ব্যাংকটি। তাতে ভোক্তা পর্যায়ের ৬ মাস ও এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার কমিয়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। আর দুই বছর মেয়াদি আমানতে ৭ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদি আমানতে সুদ দিচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। এসএমই গ্রাহকদের আমানতেও একই হারে সুদ দিচ্ছে ব্যাংকটি। কয়েকটি ব্যাংক সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্টসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক একই হারে আমানতের সুদ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে।

তবে এর মধ্যেও উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহে করছে কেউ। এবি ব্যাংক ১৩ শতাংশ সুদে ৬ মাস, ১ ও ২ বছর মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করছে। সাড়ে ৫ বছরেই টাকা দ্বিগুণ, এই অফারেও ব্যাংকটি আমানত নিচ্ছে।

* সরকারের পক্ষ থেকে ঋণের সুদহার কমানোর চাপ আছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।* দীর্ঘ মেয়াদে সুদের গতিপথ অনিশ্চিত থাকায় ব্যাংকগুলো স্বল্প মেয়াদি আমানতে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

কেন কমছে সুদহার

উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সুদহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই বছর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধানের সীমাও ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ১৫ বছর মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদ ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ নেমেছে, যা আগের সুদহারের চেয়ে প্রায় সোয়া ১ শতাংশ কম। এ ছাড়া ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদও আগের চেয়ে সোয়া ১ শতাংশের বেশি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ। পাশাপাশি সব ধরনের বিল-বন্ডের সুদও ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদ কমে এসেছে ৮ দশমিক ৭২ শতাংশে, ১৮২ দিনের বিলে সুদ ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ ও ১৬৪ দিনের বিলে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ফলে সরকারি বিল-বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। জুন শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য তারল্য প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এক মাসেই বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। বিল-বন্ডের সুদহার কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও তাই বাধ্য হয়ে আমানতের সুদহার কমাচ্ছে।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমানতের সুদহার কমিয়ে তহবিল ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। এখন সবাই গুরুত্ব দিচ্ছে ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদি আমানতে। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে সুদহার কোথায় যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি আমানতে অনেকে সুদও কম দিচ্ছে। ব্যাংকভেদে সুদহার ভিন্ন হয়। আমরা আমাদের মতো করে নতুন সুদহার নির্ধারণ করেছি।’