
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাত বেশ টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। এতে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ করে টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে।
নামের সঙ্গেই ‘অ্যাগ্রিকালচার ও কমার্স’ যুক্ত আছে। কৃষি ও বাণিজ্যের মেলবন্ধনে আপনার ব্যাংকের ভূমিকা কী?
এস এম মঈনুল কবীর: এসবিএসি ব্যাংক ‘সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করে। যদিও বর্তমানে এই নামের সংক্ষিপ্ত রূপে ব্যাংকটি কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসবিএসি ব্যাংক কৃষি, সিএমএসএমই এবং বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে কার্যক্রম চালালেও সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করে আসছে। নামের মধ্যেই অ্যাগ্রিকালচার ও কমার্স শব্দ থাকায়, এ খাতের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই আমরা কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন, সেচ ও কৃষি সরঞ্জামসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে গুরুত্ব দিয়ে অর্থায়ন করছি। আমরা কৃষিঋণের নির্ধারিত লক্ষ্যের বেশি বিতরণ করে থাকি। এখন আমাদের ব্যাংকের মোট ঋণের ৫০ ভাগ এসএমই খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। যাতে উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি।
প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি-উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
এস এম মঈনুল কবীর: প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তাদের তেমন কোনো প্রস্তুতি থাকে না। ব্যাংকারদের একটি ঋণ প্রস্তাব তৈরি করতে হয়। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত জামানত, প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব এবং ব্যাংকিং সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্বের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ ছাড়া কৃষির মৌসুমি প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা
সহজলভ্য ব্যাংকিং সেবা ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছি।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনায় আপনাদের কৌশল কী ছিল?
এস এম মঈনুল কবীর: করোনাভাইরাসের পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সংকট তৈরি হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেও আমরা সাধ্যমতো গ্রাহকদের আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলাসহ অন্যান্য বৈদেশিক বাণিজ্য–সম্পর্কিত সেবা দিতে পেরেছি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় বৈদেশিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এরপরও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গ্রাহকের ব্যবসার ধরন, আর্থিক সক্ষমতা ও লেনদেনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আমরা সহায়তা করে আসছি।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ধরে রাখতে এসবিএসি ব্যাংকের অবস্থান কী?
এস এম মঈনুল কবীর: এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাত বেশ টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। এতে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ করে টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এসবিএসি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ কিছু বাড়লেও তা তুলনামূলক সহনীয় বলা যায়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সে আলোকে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তা, আদায় জোরদারকরণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আশা করছি, খেলাপি ঋণের হার খুব দ্রুতই সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে সক্ষম হব। আর্থিক খাত হিসেবে একটি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, বোর্ডের কমিটি এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে; যাতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় আবশ্যিকভাবে সুশাসন নিশ্চিত হয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে একটি ব্যাংক স্বাভাবিক নিয়মেই সফলতার দিকে এগিয়ে যায়।
প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত জামানত, প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব এবং ব্যাংকিং সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্বের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।এস এম মঈনুল কবীর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী, এসবিএসি ব্যাংক
আপনার ব্যাংকে গ্রাহকের আমানত কতটা সুরক্ষিত?
এস এম মঈনুল কবীর: আমাদের কাছে গ্রাহকের আমানত শুধু একটি আর্থিক হিসাব নয়, বরং মানুষের সারা জীবনের সঞ্চিত স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অবলম্বন। এই অর্থের সুরক্ষা ব্যাংকের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমি সব সময় মনে করি, একটি ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা তখনই গড়ে ওঠে, যখন তারা নিশ্চিত থাকে যে তাদের অর্থ শতভাগ নিরাপদ।
এই কারণেই আমরা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর করেছি। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে জানাতে চাই, এসবিএসি ব্যাংকের কোনো গ্রাহক টাকা তুলতে পারেনি, এমন একটি ঘটনাও ঘটেনি। নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এসবিএসি ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বিগত ছয় মাসে আমাদের আমানত সাড়ে ১৩ শ কোটি টাকা বেড়েছে। ঋণ প্রদানেও আমরা খুবই সতর্ক।
এসবিএসি ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা কীভাবে নিশ্চিত করছে, যা আর্থিক সেবাকে সহজীকরণে ভূমিকা রাখছে?
এস এম মঈনুল কবীর: এসবিএসি ব্যাংক কার্যক্রমের শুরু থেকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে সর্বোচ্চ গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করেছে। আমাদের ডিজিটাল লেনদেনব্যবস্থা অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সর্বাধুনিক। এসবিএসি ব্যাংক মোবাইল ওয়ালেট সার্ভিস ‘বাংলাপে’ গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেনব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’–এর সঙ্গে বাংলাপের সংযুক্তিতে ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের সুযোগ আরও বাড়িয়েছে। আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা ‘এসবিএসি ক্লিক’ এবং ইকেওয়াইসি ‘এসবিএসি ফাস্ট’–এর মাধ্যমে শাখায় না এসেও অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা ই-লোন চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।