
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তর এখন শুধু লেনদেনকে অনলাইনে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গ্রাহকের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও সহজলভ্য করার দিকে গুরুত্ব বাড়ছে। মিডল্যান্ড ব্যাংকও এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিজিটাল সেবার পরিধি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ করছে। এ বিষয়ে কথা বলেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ।
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডিজিটাল উদ্ভাবনে মিডল্যান্ড ব্যাংক কীভাবে নিজেদের এগিয়ে রেখেছে?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তর এখন শুধু লেনদেনকে অনলাইনে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গ্রাহকের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও সহজ, দ্রুত ও সহজলভ্য করার দিকে গুরুত্ব বাড়ছে। মিডল্যান্ড ব্যাংকও এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিজিটাল সেবার পরিধি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ করছে।
আমরা ডিজিটাল ব্যাংকিংকে শুধু একটি সরবরাহ চ্যানেল হিসেবে দেখছি না; বরং এটিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং মডেলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছি। ই–কেওয়াইসি, কাগজবিহীন হিসাব, মিডল্যান্ড অনলাইন, ডিজিটাল ডিপোজিট ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় ঋণের উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকের পথচলাকে আরও সহজ করার চেষ্টা করছি। ‘মিডল্যান্ড অনলাইন’–এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা ডিজিটাল উপায়ে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে পারছেন এবং ব্যালেন্স দেখা, আন্তব্যাংক ও মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ ও কিউআরভিত্তিক পেমেন্টসহ বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন। পাশাপাশি ই-লোন, ডিভাইস ফাইন্যান্সিং, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল কার্ডের মতো সেবাও চালু করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহক যেন প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে নিতে পারেন।
অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং ও ই–কেওয়াইসির মাধ্যমে গ্রাহকদের শাখামুখী না করার ক্ষেত্রে আপনাদের প্রাপ্তি ও চ্যালেঞ্জ কী?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং ও ই-কেওয়াইসি দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকসেবা দেওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে হিসাব খোলা ও দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য শাখার ওপর নির্ভরতা কমছে। অনেক সেবা এখন গ্রাহক ঘরে বসেই নিতে পারেন। এর ফলে গ্রাহকের সময় ও খরচ সাশ্রয় হচ্ছে, একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার বাইরে আরও বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে পারছে।
আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহক যেন প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে নিতে পারেন।ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিডল্যান্ড ব্যাংক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবহার করে ডিজিটাল উপায়ে ঋণ দেওয়ায় কতটুকু সফল হয়েছেন?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: ডিজিটাল উপায়ে ঋণ বিতরণ এখনো একটি বিকাশমান খাত। আমরা ডেটানির্ভর ঋণ স্কোরিং এবং ডিজিটাল স্কোরিং ব্যবহার করে দ্রুত ও ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ২০২৫ সালে চালু হওয়া এমডিবি ডিজিটাল ন্যানো লোন, যা এখন ই-লোন নামে পরিচিত, এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি ডিজিটাল ঋণপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত ডেটা অ্যানালিটিকসের যথাযথ ব্যবহার এই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করবে।
অনলাইন আমানত ও লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী কৌশল নিচ্ছেন?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: ডিজিটাল ব্যাংকিং যত বাড়ছে, সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও তত বাড়ছে। এখানে শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নয়, গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা এবং গ্রাহক ও কর্মীদের সচেতনতা—সব বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি গ্রাহকের আস্থা হলো ডিজিটাল ব্যাংকিং কৌশলের মূল ভিত্তি। অথেনটিকেশন, ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি), লেনদেনে তদারকি, সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে গ্রাহককে নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতন করাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পদের মান ধরে রাখার মূল রহস্য কী?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে ঋণের গুণগত মান ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর কোনো একক কৌশল নেই। ঋণ মূল্যায়ন, ঋণ গ্রহণকারী নির্বাচন, নিয়মিত তদারকি, সম্পদের মানকে সমান গুরুত্ব দিই। তাই মিডল্যান্ড ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, ঋণের উদ্দেশ্য ও পরিশোধের সম্ভাবনা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জামানতের মান মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। ঋণ বিতরণের পরও কিস্তি পরিশোধের ধারা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রাথমিক লক্ষণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
জেন–জি ও তরুণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ পরিকল্পনা কী?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: ব্যাংকিং সেবায় কাগজবিহীন হিসাব, ডিজিটাল ডিপোজিট, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ঋণ, জীবনঘনিষ্ঠ আর্থিক পণ্য আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চাই একজন তরুণ গ্রাহক যেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রিপেইড কার্ড, কিউআর পেমেন্ট, অ্যাপভিত্তিক সেবা এবং বিভিন্ন গ্রাহক সুবিধা তরুণদের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা ও সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
আগামী পাঁচ বছরে মিডল্যান্ড ব্যাংকের ডিজিটাল রূপান্তরের পরিকল্পনা কী?
ইমতিয়াজ ইউ. আহমেদ: আগামী পাঁচ বছরে মিডল্যান্ড ব্যাংক ডিজিটাল ব্যবস্থায় আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে চায়। ডিজিটাল অনবোর্ডিং থেকে শুরু করে আমানত, লেনেদন, ঋণ, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে অটোমেশন ও বিশ্লেষণের ব্যবহার বাড়ানো হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিকস, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ফিনটেক অংশীদারত্বের ব্যবহার বাড়বে। তবে প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে এসএমই, খুচরা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আমাদের নজর আরও বাড়বে। তবে ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি সুশাসন, সাইবার নিরাপত্তা ও সম্পদের মান নিয়ে নজর থাকবে।