
রাষ্ট্রমালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পৌনে তিন মাস পর নতুন চেয়ারম্যান পেয়েছে আজ সোমবার। তাঁর নাম কাজী শাইরুল হাসান। আগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া পদত্যাগ করেছিলেন গত ১৬ মার্চ। এর পর থেকে পদটি শূন্য ছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আজ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান পদে কাজী শাইরুল হাসানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্রের পর তিনি এ পদে যোগ দেবেন।
ব্যাংক, আর্থিক সেবা, শিল্প বিনিয়োগ, টেলিযোগাযোগ ও ভোগ্যপণ্য খাতে চার দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে করপোরেট ব্যক্তিত্ব কাজী শাইরুল হাসানের। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশীয় শীর্ষ করপোরেট গ্রুপ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করে তিনি বাংলাদেশের করপোরেট ও আর্থিক খাতে একটি পরিচিত নাম। কর্মজীবনের ৪১ বছরের বেশি সময় তিনি ব্যবস্থাপনা, বিপণন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, ব্যাংক সেবা এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন।
কাজী শাইরুল হাসানের পেশাগত অভিজ্ঞতার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাত। প্রায় ২৬ বছর তিনি ব্যাংক ও আর্থিক সেবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করেছেন। ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি) খাতে প্রায় ১১ বছর এবং টেলিযোগাযোগ ও সেবা খাতে আরও কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জনকারী কাজী শাইরুল হাসান। পাশাপাশি শিল্প ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমাও অর্জন করেন।
কর্মজীবন শুরু যেখান থেকে
কাজী শাইরুল হাসান কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭৮ সালে গ্রিনল্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড ট্র্যাক্টরস কোম্পানিতে (গেটকো) বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে। তিনি ছিলেন ক্যাটারপিলার ব্র্যান্ডের ভারী যন্ত্রপাতি বিক্রির দায়িত্বে। পরে ১৯৭৯ সালে ফাইসন্স (বাংলাদেশ) লিমিটেডে যোগ দেন এবং প্রায় এক দশক প্রতিষ্ঠানটির ভোক্তা পণ্য বিভাগের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা, বিক্রয় ও বিপণন, বিতরণব্যবস্থা পরিচালনা, বাজার গবেষণা এবং বিক্রয় দল গড়ে তোলার মতো বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ইউনিলিভার বাংলাদেশের অংশ হয়ে যায়।
১৯৮৯ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকে যোগ দিয়ে কাজী শাইরুল হাসান কর্মজীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। প্রায় ১০ বছর তিনি এ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা সেবা, কার্ড ব্যবসা ও ভ্রমণসেবা কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন।
২০০০ সালে কাজী শাইরুল হাসান গ্রামীণ টেলিকমের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেন। গ্রামীণফোনের অন্যতম অংশীদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ টেলিকম তখন দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বহুল আলোচিত ‘ভিলেজ ফোন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছিল। তখন প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এরপর এসটিএস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আন্তর্জাতিক স্কুল ঢাকা, অ্যাপোলো হাসপাতালসহ গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত তদারকির দায়িত্ব পালন করেন কাজী শাইরুল হাসান। ২০০২ সালে অ্যাঙ্গোলাভিত্তিক ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এফএমসিজি গ্রুপ গোলফরেট হোল্ডিংসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এক হাজারের বেশি কর্মী–সংবলিত এই প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রমের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
কাজী শাইরুল হাসান দেশে ফিরে ২০০৩ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্যাংকটির ক্রেডিট কার্ড ব্যবসা, এটিএম নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ভোক্তা ঋণ পণ্য চালু হয়। পরে ওয়ান ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান হিসেবে রিটেইল ব্যাংকিং, এসএমই অর্থায়ন এবং প্রবাসী আয় ব্যবসার নেতৃত্ব দেন।
কাজী শাইরুল হাসান ২০০৮ সালে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিতে (সাবিনকো) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পান। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, আইনি জটিলতা ও অকার্যকর বিনিয়োগে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে যায়। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক বিডিবিএলের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।