গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংককে সাত হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টিতে এই টাকা ধার দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। এই ধারের টাকায় ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করবে ন্যাশনাল ব্যাংক। এরই মধ্যে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে সেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিক ব্যাংকিং শুরু হলে গ্রাহকেরা ব্যাংকটি থেকে চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকেরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি থেকে চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন না। এ কারণে সম্প্রতি আদালতের শরণাপন্ন হন ব্যাংকটির চার আমানতকারী। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চার আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এরপর বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নজরে আসে। সরকার ব্যাংকটির লেনদেন স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তারপর একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায়। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার থেকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক।
জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে আমরা ১০ শতাংশ সুদে ন্যাশনাল ব্যাংককে টাকা ধার দিয়েছি। সময়মতো এই টাকা ফেরত না পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের টাকা ফেরত দেবে। ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে এই ধার দেওয়া হয়েছে।’
জানা গেছে, ধারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সোনালী ব্যাংক টাকা ফেরত না পেলে মেয়াদ শেষের তিন দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে এই টাকা ফেরত দেবে। এই শর্তে ব্যাংকটিকে টাকা ধার দিয়েছে সোনালী ব্যাংক।
এর আগে ব্যাংকটিকে স্বাভাবিক লেনদেনে বৃহস্পতিবার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ওই বৈঠকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে তারল্য সহায়তা চেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করে ন্যাশনাল ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নতুন করে টাকা না ছাপিয়ে গ্যারান্টির বিপরীতে টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর বিষয়টি নিয়ে সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর তিন মাসের জন্য টাকা ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে ওই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে সেই দায় মেটাতে হয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ হিসেবে ওই অর্থের দায় তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এ অর্থের পুরোটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে গ্রুপটি ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। এখন ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা। আগের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি এখনো চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। ব্যাংকটি ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান গুনছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের দেওয়া মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি আছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে।