আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কর্মকর্তাদের চাপের মুখে পদত্যাগ করা ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। আজ রোববার রাতে বেসরকারি খাতের ব্যাংকটিকে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে জানান, তিনি প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফোন পেয়েছেন। এরপর ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার চিঠি পান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ‘মব জাস্টিস’ করে তাঁকে পদত্যাগ করানো হয়েছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ জন্য তাঁকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
খুরশীদ আলমকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন। এর মধ্যে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
মো. খুরশীদ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর ও এমবিএ করেন। ১৯৮৮ সালে সহকারী পরিচালক পদে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, কৃষিঋণ বিভাগ, পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন, এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ, সচিব বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। খুরশীদ আলম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে আজ রোববার ইস্তফা দেন অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় খুরশীদ আলমকে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে এম জুবায়দুর রহমানকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর থেকে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তখন গভর্নর ছিলেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং গভর্নর পদে মোস্তাকুর রহমান যোগদানের পর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতবিরোধ হয়। অনলাইনে সভায় উপস্থিত থাকার শর্তে দেড় মাসের ছুটিতে দেশের বাইরে যান ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। পাশাপাশি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকেও ছুটিতে পাঠানো হয়। গত ১২ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তাঁদের এই ছুটি অনুমোদিত হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আজ ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভা ডাকা হয়েছিল। ব্যাংকের গ্রাহক ও কিছু কর্মকর্তা প্রধান কার্যালয়ের নিচে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁরা ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগ না করার জন্য আন্দোলন করেন। তবে তাঁরা চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ চান। এমন পরিস্থিতিতে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান এম জুবায়দুর রহমান।
এদিকে ছুটিতে থাকা এমডি ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে ব্যাংকটির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে পর্ষদের সভাটি বাতিল হওয়ায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে এম জুবায়দুর রহমান ও ওমর ফারুক খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের সরিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমেছে ১৩৭ কোটি টাকায়। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ এখন খেলাপি।
ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হিস্যা ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে (মার্চ, ২০২৬) নেমেছে। অন্যদিকে ব্যাংকটির প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।