
আওয়ামী লীগের আমলে যখন এইচ বি এম ইকবাল চেয়ারম্যান এবং মোহাম্মদ আবু জাফর ও এম রিয়াজুল করিম ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তখন ২৬ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জালিয়াতি করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তখন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ছিলেন শহিদ হাসান মল্লিক, সৈয়দ নওশের আলী ও শাহেদ সেকান্দার।
পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখা গ্রাহকদের অগোচরে ভুয়া বিক্রি চুক্তি, ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (এলসি) তৈরি এবং ঋণ তৈরি করেছে। পরে তারিখ ও পরিমাণবিহীন ফাঁকা চেক দিয়ে অর্থ ঋণ আদালতে মামলাও করেছে। অন্যদিকে দিনের পর দিন হিসাব বিবরণী চাইলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রপ্তানিকারকদের কাউকেই তা দেয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঢাকার পল্টনে আজ শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন ২৬ প্রতিষ্ঠানের রপ্তানিকারক মালিকেরা। তাঁদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডোয়াসল্যান্ড অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরিফুর রহমান।
প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, ব্যাংক কীভাবে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জালিয়াতি করেছে, পুরো ঘটনা নিয়ে তদন্ত করলেই তা বেরিয়ে আসবে। দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো নিরীক্ষা ফার্মের মাধ্যমে এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ব্যবস্থা করতে তাঁরা গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সহযোগিতা চেয়েছেন। রপ্তানিকারকদের একটাই চাওয়া, তদন্ত হোক।
ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আমানা নিটেক্স, আমানা নিটেক্স লিমিটেড, আমানা নিট ফ্যাশন, আর টি ফ্যাশন, অহনা নিট কম্পোজিট, জেবন অ্যাপারেলস, জননী ফ্যাশন, নিট রিফ্লেক্স, নিট গার্ডেন, আর এজেড অ্যাপারেলস, টোটাল ফ্যাশন, ইউনাইটেড নিটওয়্যার, ওয়েস্ট অ্যাপারেলস, অবন্তী কালার টেক্স, ক্রোনি অ্যাপারেলস এবং প্রমিনেন্ট অ্যাপারেলস।
বেশ কয়েকটি নিরীক্ষার কাজ চলমান। একটি নিরীক্ষা হবে শুধু নারায়ণগঞ্জ শাখাকে ফোকাস করে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দিয়ে ব্যাংকে একটা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আশা করছি, সবার জন্যই সহজ সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবেমনজুর মফিজ, এমডি, প্রিমিয়ার ব্যাংক
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি নথিপত্রের সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কিনে তার বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ চলতি হিসাবে জমা করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক। জমা করা ওই অর্থে পরে মার্কিন ডলার কিনে একতরফাভাবে ও অনুমতি ছাড়া জাল ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করে প্রিমিয়ার ব্যাংক। এই অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে গেলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিরীক্ষা করে। নিরীক্ষায় উঠে আসে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাংকের বকেয়া টাকার পরিমাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণসীমার কয়েক গুণ বেশি, যা বেআইনি, অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ পুনঃতফসিল করতে চাপ দিলে অনেকেই অস্বীকৃতি জানায়। তখন ব্যাংক হুমকি দেয় যে পুনঃতফসিলের শর্ত মেনে স্বাক্ষর না করলে সব ধরনের ঋণসুবিধা, এলসি সুবিধা, প্যাকিং ঋণ (পিসি) ইত্যাদি বাতিল করা হবে। এগুলো বজায় না থাকলে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-মজুরি দেওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করেন, যা পরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাতিল করে দেয়। পরে তিনটি বাদে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রিমিয়ার ব্যাংক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অবৈধ ঋণের বোঝা একসময় ব্যবসায়ীদের জন্য চরম মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে চরম জবরদস্তিমূলক আচরণ করতে থাকে। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর টোটাল ফ্যাশনের প্রতিষ্ঠাতা এমডি হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ধারাবাহিকভাবে ৩৭ বার ফোন করে ঋণ পুনঃতফসিলের নথিপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দেন। এর চার দিনের মাথায় তিনি মারা যান।
পরের বছর ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট অ্যাপারেলসের এমডি আসিফ হাসান মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী রোকসান আরা আহমেদের বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার ব্যাংকের তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ আবু জাফর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মিথ্যা অভিযোগ করেন। মানসিক ও সামাজিক চাপ সইতে না পেরে ৯ দিনের মাথায় ১২ সেপ্টেম্বর মারা যান আসিফ হাসান মাহমুদ। জননী ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি গৌতম পোদ্দারও একই কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে পক্ষাঘাত অবস্থায় আছেন।
প্রিমিয়ার ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে কত টাকা বেশি দাবি করছে, তা সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাইলে ডোয়াসল্যান্ড অ্যাপারেলসের এমডি আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো ব্যাংকের হিসাব চেয়েও পাইনি।’
এইচ বি এম ইকবালের সময়ের জালিয়াতি নিয়ে এত দিন পর কেন সংবাদ সম্মেলন করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা শুরুতে ব্যাংকের কাছেই অন্যায়ের প্রতিকার চেয়েছি। না পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছি। পরে আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছি। নিষ্পত্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ এখনো পাইনি। আমরা চাই ভালো একটি ফার্ম দিয়ে শুধু নিরীক্ষাটা হোক।’
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ওঠে আসা বিষয়গুলো আজ বিকেলে মুঠোফোনে জানানো হয় প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান এমডি মনজুর মফিজকে। এ নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি নিরীক্ষার কাজ চলমান। একটি নিরীক্ষা হবে শুধু নারায়ণগঞ্জ শাখাকে ফোকাস করে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দিয়ে ব্যাংকে একটা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আশা করছি, সবার জন্যই সহজ সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে।’