বাংলাদেশের ব্যাংকের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি ডেবিট কার্ডও এখন বিদেশে নানা কাজে ব্যবহার করা যায়। একসময় বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ছিল একচেটিয়া। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারায় বদল এসেছে। তাতে ডেবিট কার্ডেরও ব্যবহার বাড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় নানা লেনদেনে।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিরা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে যে লেনদেন করেন, তার বেশির ভাগই কয়েকটি দেশনির্ভর। এর মধ্যে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন করছেন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকায়। আর বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় যুক্তরাজ্যে। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডে যত লেনদেন হয়েছে, তার প্রায় ১৪ শতাংশই খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। একই সময়ে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে বিদেশের মাটিতে যত লেনদেন হয়েছে, তার প্রায় ১৬ শতাংশই হয়েছে যুক্তরাজ্যে। ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের দিক থেকে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। তৃতীয় অবস্থানে যুক্তরাজ্য, চতুর্থ সিঙ্গাপুর ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ভারত। ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে বিদেশে বাংলাদেশিরা যে লেনদেন করেছেন, তার অর্ধেকের বেশি লেনদেন হয়েছে এই পাঁচ দেশে। এর বিপরীতে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে লেনদেনের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব ও আয়ারল্যান্ড। এ দেশের ডেবিট কার্ডের বৈদেশিক লেনদেনের প্রায় ৫৫ শতাংশই হয়েছে এই পাঁচ দেশে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এ কারণে দেশটিতে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডের ব্যবহারও বেশি। বিদেশে যাওয়ার সময় এসব শিক্ষার্থী নিজের নামে দ্বৈত মুদ্রায় ব্যবহার উপযোগী ডেবিট কার্ড সঙ্গে নিয়ে যান এবং মাসে মাসে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেন। আর দেশে থাকা এসব শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা মাসে মাসে ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দেন। ফলে বিদেশে বসবাসকারী এ ধরনের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় না। যেহেতু ডেবিট কার্ড ব্যবহারে কোনো ধরনের সুদের বিষয় নেই, তাই অনেকে ক্রেডিট কার্ডের তুলনায় ডেবিট কার্ড ব্যবহারে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, বিদেশের মাটিতে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। ডিসেম্বরে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে বাংলাদেশিরা খরচ করেছেন ৩৯২ কোটি টাকা, নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বিদেশে ডেবিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১৯ কোটি টাকার যা ৫ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ডিসেম্বরে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪৯১ কোটি টাকার। তার আগের মাসে অর্থাৎ নভেম্বরে এ পরিমাণ ছিল ৫১১ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ২০ কোটি টাকার।
জানতে চাইলে বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যাংকের ডেবিট কার্ডে দ্বৈত মুদ্রায় লেনদেনের সুবিধা রয়েছে। তাই ক্রেডিট কার্ডের বদলে ডেবিট কার্ড ব্যবহারে অনেকেই বেশি আগ্রহী। ডেবিট কার্ড ব্যবহারে ধারের কোনো বিষয় নেই। এ কারণে টাকা ফেরত দেওয়া ও তার জন্য সুদ প্রদানেরও কোনো বিষয় নেই। যুক্তরাজ্যে যেহেতু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, তাই সেখানে ডেবিট কার্ডের ব্যবহারও বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ডিসেম্বরে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডে বিদেশের মাটিতে খরচ হওয়া ৩৯২ কোটি টাকার মধ্যে যুক্তরাজ্যেই খরচ হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ কোটি, ভারতে ৩৬ কোটি, সৌদি আরবে ৩৫ কোটি এবং আয়ারল্যান্ডে খরচ হয়েছে ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩৯২ কোটি টাকার মধ্যে এই পাঁচ দেশেই খরচ হয়েছে ২১৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে বিদেশের মাটিতে খরচ হওয়া ৪৯১ কোটি টাকার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই খরচ হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ হয়েছে থাইল্যান্ডে, ৬৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে ৪৪ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩৮ কোটি ও ভারতে ৩৫ কোটি টাকা ক্রেডিট কার্ডে খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে খরচ হওয়া ৪৯১ কোটি টাকার মধ্যে এই পাঁচ দেশেই খরচ হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা।
বিদেশে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেবিট কার্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। ডেবিট কার্ডের ব্যবহারের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম খাত বিভিন্ন বাণিজ্যিক সেবা ক্রয়। তার বিপরীতে বিদেশের মাটিতে ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কেনাকাটায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় বিভিন্ন খুচরা দোকানে। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার পরিবহন খাতে।