
দেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ডেবিট কার্ডের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্–বাংলা ব্যাংক। একমাত্র ব্যাংক হিসেবে এটির ডেবিট কার্ডের সংখ্যা দেড় কোটি ছুঁই ছুঁই। গত বছর শেষে ব্যাংকটির ইস্যু করা মোট ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ১ হাজার ১৭৭টিতে। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে আর কোনো ব্যাংকের ডেবিট কার্ডের সংখ্যা এখনো কোটির ঘর ছাড়াতে পারেনি।
ডেবিট–ক্রেডিট কার্ড–সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডেবিট কার্ডের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। গত বছর শেষে শরিয়াহভিত্তিক দেশের বৃহত্তম এই ব্যাংকের মোট ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ৮৯ লাখ ৫ হাজার ৩৭৪টি। এই তালিকায় শীর্ষ পাঁচে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো যথাক্রমে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, বেসরকারি ব্র্যাক ও পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে গত বছর শেষে সোনালী ব্যাংকের ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯টি, ব্র্যাক ব্যাংকের ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪টি ও পূবালী ব্যাংকের ১৩ লাখ ২৬ হাজার ১৮৯টি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শেষে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ৬১টি ব্যাংকের ইস্যু করা মোট ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮১০টি। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকেরই রয়েছে ২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৩টি, যা মোট ডেবিট কার্ডের প্রায় ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে ডেবিট কার্ড ব্যবহারকারীদের প্রায় তিন–চতুর্থাংশই পাঁচ ব্যাংকের।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো গ্রাহক যখন ব্যাংক হিসাব খোলেন তখন ওই হিসাবের বিপরীতে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড ইস্যু করে। এর বাইরে হিসাব খোলা ছাড়াও গ্রাহকেরা তাঁদের পছন্দের ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নিতে পারেন। ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ড সাধারণত গ্রাহকের জমা অর্থের বিপরীতে লেনদেনে ব্যবহার হয়। আর ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহক মূলত ব্যাংক থেকে ঋণ করে তাঁর প্রয়োজন মেটান। পরে সেই ঋণ শোধ করতে হয়। তবে ব্যাংক খাতে ডেবিট ও ক্রেডিট—এ দুই ধরনের কার্ডেরই প্রচলন বেশি। দেশে নগদ টাকার লেনদেন কমাতে বিভিন্ন ধরনের কার্ডভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা চালুর অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলো কার্ড ইস্যু করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডেবিট কার্ডের দিক থেকে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় ষষ্ঠ থেকে দশম অবস্থানে আরও রয়েছে যথাক্রমে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), দি সিটি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মধ্যে গত বছর শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ১৫ হাজার ৮৩৫টি, ইউসিবির ১০ লাখ ১০ হাজার ৯৬৬টি, সিটি ব্যাংকের ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯০০টি, ব্যাংক এশিয়ার ৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৯টি ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৬১১টি।
দেশে প্রতিবছরই ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বাড়ছে। ব্যাংকাররা এটিকে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি ভালো অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, কার্ডে লেনদেন যত বাড়বে, নগদ অর্থের ব্যবহার তত কমবে। ফলে টাকা ছাপানোসহ খরচ কমবে। সেই সঙ্গে লেনদেনে অনেক বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। কারণ, নগদ অর্থের সব লেনদেনকে ট্র্যাক করা যায় না। কিন্তু কার্ডের লেনদেন নথিভুক্ত থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫৯টি। গত বছর শেষে যা প্রথমবারের মতো চার কোটির ঘর ছাড়িয়েছে। এতে চার বছরের ব্যবধানে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় কোটি বা ৫৯ শতাংশ। কার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্ডে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ২০২১ সালে দেশে ডেবিট কার্ডে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। গত বছর শেষে এই লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ডেবিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ২৫ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা বা ১৩৫ শতাংশ।
কার্ডে লেনদেন যত বাড়বে, নগদ টাকার ব্যবহার তত কমবে। এটি অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক। কারণ, নগদ টাকা ছাপাতে অনেক বেশি অর্থ খরচ হয়। আবার ডিজিটাল বা কার্ডে লেনদেন বাড়লে তাতে দুর্নীতিও কমে যাবে, লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।আহসান জামান চৌধুরী, এমডি, ট্রাস্ট ব্যাংক
ব্যাংকাররা বলছেন, একসময় ডেবিট কার্ড শুধু দেশের অভ্যন্তরে লেনদেনে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু এখন ডেবিট কার্ডে লেনদেন আর দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ডেবিট কার্ডও এখন বিদেশে ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ডেবিট কার্ডে বিদেশে লেনদেন হয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা। এর আগের মাসে অর্থাৎ নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বিদেশে ডেবিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১৯ কোটি টাকা বা ৫ শতাংশের বেশি।
দেশে ডেবিট কার্ডের সংখ্যা এবং এই কার্ডে লেনদেন বৃদ্ধির বিষয়ে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহসান জামান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কার্ডে লেনদেন যত বাড়বে, নগদ টাকার ব্যবহার তত কমবে। এটি অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক। কারণ, নগদ টাকা ছাপাতে অনেক বেশি অর্থ খরচ হয়। আবার ডিজিটাল বা কার্ডে লেনদেন বাড়লে তাতে দুর্নীতিও কমে যাবে, লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সব মিলিয়ে তাই নগদ অর্থের লেনদেনের চেয়ে ব্যাংকগুলো এখন কার্ডসহ ডিজিটাল ব্যবস্থার নানা লেনদেনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
কার্ডের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় থাকা ট্রাস্ট ব্যাংকের অর্জন সম্পর্কে আহসান জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সব ডেবিট কার্ড আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহার উপযোগী। এ কারণে আমাদের কার্ডের প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ বাড়ছে। এ ছাড়া আমাদের গ্রাহকদের মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা রয়েছেন। এ ছাড়া আমরা নতুন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্ডের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন এই প্রজন্মকে যুক্ত করার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কার্ডের ক্ষেত্রে আমাদের ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আশা করছি আমরা শীর্ষে পাঁচে উঠে আসব শিগগিরই।’