
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ শ্রেণির পণ্য আমদানি হয়। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে উন্নয়নকাজের নানা উপকরণ রয়েছে এ তালিকায়। তবে হাজারো পণ্যের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটির আমদানিই বিপুল। কোনো কোনো পণ্যের পরিমাণ বছরে কোটি টন ছাড়িয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে মোট ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ পণ্যই ৯ কোটি ৯৮ লাখ টন। অর্থাৎ আমদানি হওয়া প্রতি ১০০ কেজি পণ্যের প্রায় ৬৩ কেজিই এই ১০ পণ্য।
শীর্ষ ১০ পণ্যে আধিপত্য শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণের। খাদ্যশস্যের মধ্যে একমাত্র গম এ তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
২৫ বছর পর শীর্ষস্থান হারাল ক্লিংকার
এনবিআরের হিসাবে, ২০০০-০১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত টানা ২৫ বছর পরিমাণের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্য ছিল সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার। এবার সেই দীর্ঘ আধিপত্যের অবসান হয়েছে।
ক্লিংকারকে সরিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে কয়লা। বিদায়ী অর্থবছরে দেশে ২ কোটি ৭ লাখ টন কয়লা আমদানি হয়েছে।
কয়লার এই উত্থান অবশ্য অপ্রত্যাশিত নয়। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। গত অর্থবছরে আমদানি হওয়া মোট কয়লার প্রায় ৭৫ শতাংশই এনেছে ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
ফলে একসময় মূলত শিল্পকারখানার জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত কয়লা এখন পরিমাণের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্যে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয় ক্লিংকার, চতুর্থ স্ল্যাগ
দীর্ঘদিনের শীর্ষস্থান হারিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে এসেছে সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার। গত অর্থবছরে ক্লিংকার আমদানি হয়েছে ১ কোটি ৯২ লাখ টন।
সিমেন্ট উৎপাদনে ক্লিংকারের পাশাপাশি স্ল্যাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশসহ কয়েক ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার হয়। শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের তালিকায় এই চারটিরই জায়গা হয়েছে। ক্লিংকারের পর সিমেন্টের আরেক কাঁচামাল স্ল্যাগ রয়েছে চতুর্থ অবস্থানে। গত অর্থবছরে স্ল্যাগ আমদানি হয়েছে ৮৩ লাখ টন। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা চুনাপাথর আমদানি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন। আর প্রায় ৫০ লাখ টন আমদানি নিয়ে ফ্লাই অ্যাশ বা ছাই রয়েছে দশম অবস্থানে।
অর্থাৎ চার ধরনের সিমেন্ট কাঁচামাল মিলিয়েই আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন। অর্থাৎ শীর্ষ ১০ পণ্যের মোট পরিমাণের বড় অংশই সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল।
তৃতীয় অবস্থানে চূর্ণ পাথর
আমদানির পরিমাণে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চূর্ণ পাথর। বিদায়ী অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ৬৮ লাখ টন চূর্ণ পাথর আমদানি হয়েছে। সড়ক, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে এই পাথর ব্যবহার হয়।
চূর্ণ পাথরের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বোল্ডার পাথরও আমদানি হয়। গত অর্থবছরে বোল্ডার পাথর আমদানি হয়েছে ৫৫ লাখ টন। পরিমাণের হিসাবে এটি রয়েছে অষ্টম অবস্থানে। নদীশাসনসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বোল্ডার পাথর ব্যবহার করা হয়।
শীর্ষ দশে একমাত্র ভোগ্যপণ্য গম
শীর্ষ ১০ আমদানি পণ্যের মধ্যে একমাত্র ভোগ্যপণ্য গম। পরিমাণের হিসাবে গম রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। গত অর্থবছরে দেশে ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে।
দেশে গমের চাহিদার আনুমানিক প্রায় ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি প্রায় ৮৫ শতাংশ চাহিদা মেটাতে হয় আমদানির মাধ্যমে। ফলে খাদ্যশস্যের মধ্যে গমই পরিমাণের হিসাবে দেশের সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্য।
রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ সপ্তম
রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল পুরোনো লোহার স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহার টুকরো রয়েছে সপ্তম অবস্থানে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫৭ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি হয়েছে। দেশের ইস্পাত কারখানাগুলোতে এসব স্ক্র্যাপ গলিয়ে বিলেট তৈরি করা হয়। পরে সেই বিলেট থেকে রডসহ বিভিন্ন ইস্পাতপণ্য উৎপাদিত হয়।
নবম অবস্থানে এলএনজি
জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রয়েছে নবম অবস্থানে। গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ টন।
দেশীয় গ্যাসের সরবরাহঘাটতি পূরণে কয়েক বছর ধরে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজি আবার গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
সব মিলিয়ে শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় কয়লা ও এলএনজির মতো জ্বালানি, সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল এবং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণেরই আধিপত্য। খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে শুধু গম। অর্থাৎ পরিমাণের হিসাবে বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশ সরাসরি ভোগের জন্য নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জানতে চাইলে সিমেন্ট, ভোগ্যপণ্য খাতের উদ্যোক্তা ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিমাণে সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যগুলোর বেশির ভাগই শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণ। এর মধ্যে সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের কাঁচামালই পাঁচটি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ বাড়লে এসব পণ্যের চাহিদাও বাড়বে।’