ঋণপত্র (এলসি) খুলে পণ্য আমদানির সুযোগ সব সময়ই ছিল, এখনো আছে। এমনকি রপ্তানিকারকের সঙ্গে আমদানিকারকের ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে এলসি খোলা ছাড়াও এত দিন পণ্য আমদানি করা যেত। তবে তার একটা মূল্যসীমা ছিল, বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার। এখন মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে যেকোনো পরিমাণ পণ্য আমদানি করা যাবে। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে নতুন আমদানি নীতি আদেশে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত সোমবার ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২৯’ জারি করেছে। ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে। এ নীতিতে আমদানি কার্যক্রমের বিভিন্ন সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া ও শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানি পণ্যের উৎপত্তির দেশসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এর মাধ্যমে পণ্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির আওতায় সুবিধা নেওয়া সহজ হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ানো হয়েছে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনা মূল্য বা ‘ফ্রি অব কস্ট’ (এফওসি) ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুবিধা।
নতুন নীতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এফওসির ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এটা একই ধরনের করা উচিত। যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, এফওসিতে পণ্য আমদানি করলে নিরাপদে রপ্তানি করা যায়, রপ্তানি আদেশও বাতিল হয় না, কোনো কারণে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠাতে হলে তার খরচ বহন করেন ক্রেতারা।
তবে পোশাক খাতের মতো নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমদানি করে রপ্তানির সুযোগ দেওয়ায় স্বাগত জানিয়েছেন মোহাম্মদ হাতেম।
নতুন আমদানি নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ), সমন্বিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি (সিইপিএ), অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাণিজ্যচুক্তির আওতায় সুবিধা নেওয়ার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
নতুন নীতি করতে আমদানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে পণ্য যাচাই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, সনদ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিষয়গুলোকে সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বেড়েছে। ফলে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে। এত দিন আমদানি করা যেত ১৬৫ সিসি পর্যন্ত। এ ছাড়া মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
* ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে।* ৩৭৫ সিসি মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ, যা এত দিন ছিল ১৬৫ সিসি পর্যন্ত।* আমদানিতে শিথিলতা, মূল্যসীমা প্রত্যাহার। বাড়ল কাঁচামাল আনার সুযোগ।* এলসি ছাড়াই যেকোনো পরিমাণ পণ্য আমদানি করা যাবে।
পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা কমানোর বিষয়েও নতুন নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস ও আমদানিপ্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করার মাধ্যমে হয়রানি ও বিলম্ব কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে এবং ব্যবসা সহজ করার স্বার্থে নতুন আমদানি নীতি আদেশটি করা হয়েছে। এতে শুল্ক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এফওসির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মাত্র তো আমদানি নীতি আদেশ হলো। প্রয়োজনে বিভিন্ন ধারা সংশোধন করা যাবে।
আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য
নতুন আমদানি নীতিমালায় ২৮ শ্রেণির পণ্য আমদানিনিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চিংড়ি; জীবিত শূকর ও শূকরজাত সব ধরনের পণ্য; পপি সিড ও পোস্তদানা; ঘাস ও ভাং; ওয়াইন লিজ ও আরগোল; ঘন চিনি; কৃত্রিম শর্ষের তেল; নিম্নমানের পণ্য অথবা পুরোনো, ব্যবহৃত, রিকন্ডিশন্ড পণ্য বা কারখানায় বাতিলকৃত বা স্টক লটের পণ্য; ব্যবহৃত মোটরসাইকেল; গ্যাস সিরিঞ্জ ইত্যাদি।
এ ছাড়া রিকন্ডিশন্ড অফিস ইকুইপমেন্ট অর্থাৎ ফটোকপিয়ার, টাইপরাইটার, টেলেক্স, ফোন, ফ্যাক্স, পুরোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার সামগ্রী ও পুরোনো ইলেকট্রনিকস সামগ্রী; সব ধরনের শিল্প স্লাজ ও স্লাজ দিয়ে তৈরি সার ও যেকোনো পণ্য; সব ধরনের বর্জ্য পদার্থ আমদানিনিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ তালিকায় আছে ‘স্টকহোম কনভেনশন অন পারসিসট্যান্ট অর্গানিক পলিউটনেসের (পিওপি)’ আওতাধীন বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক ও শিল্পজাত দ্রব্য। এসব দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে এলড্রিন, ক্লোরডেন, ডিডিটি, ডাই-এলড্রিন, এনড্রিন, হেপ্টাক্লোর, মিরেক্স, টক্সফেন, হেক্সাক্লোরোবেনজিন, পলিক্লোরিনেটেড বাই-ফিনাইল; হাইড্রোলিক হর্নসহ ৭৫ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বমাত্রার সব হর্ন; পলি প্রোপাইলিন ও পলিথিন ব্যাগ; দুই স্ট্রোক ইঞ্জিন ও চেসিসবিশিষ্ট থ্রি-হুইলার যানবাহন অর্থাৎ টেম্পো, অটোরিকশা ইত্যাদি।
বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর প্রকাশিত মানচিত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের সীমারেখা দেখানো হয়নি এমন মানচিত্র, চার্ট ও ভৌগোলিক গ্লোব, হরর কমিকস, অশ্লীল, নাশকতামূলক সাহিত্য পুস্তিকা, সংবাদ সাময়িকী, পোস্টার, ফটো, ফিল্ম, কাগজপত্র, অডিও-ভিডিও টেপ ইত্যাদি পণ্যও আমদানিনিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে।
নিয়ন্ত্রিত পণ্য
নিষিদ্ধ পণ্যের বাইরেও এমন কিছু পণ্য রয়েছে, যেগুলো শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আমদানি করা যায়। নতুন আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী, এগুলো হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ফার্নেস অয়েল, সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের কম ব্যাস বা দৈর্ঘ্যের মাছ ধরার কারেন্ট জাল, পাঁচ বছরের পুরোনো অধিক গাড়ি, তিন বছরের বেশি পুরোনো ও ১৬৫ সিসির ঊর্ধ্বে সব ধরনের মোটরসাইকেলসহ এলএনজি ও লিকুইফাইড প্রপেন ও বিউটেনস ছাড়া পেট্রোলিয়াম গ্যাস ও অন্যান্য গ্যাসীয় হাইড্রো-কার্বন এবং পেট্রোলিয়াম কোক ও পেট্রোলিয়াম বিটুমিন ছাড়া পেট্রোলিয়াম তেলের রেসিডিউ।
আমদানি নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা ছাড়া উপমহাদেশীয় ভাষায় নির্মিত কোনো চলচ্চিত্র আমদানি করা যাবে না। তবে বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্র সাফটাভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানির বিপরীতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সাপেক্ষে সমসংখ্যক চলচ্চিত্র আমদানি করা যাবে।
নতুন আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী সব ধরনের খেলনা ও বিনোদনমূলক পণ্যের ক্ষেত্রে কোন বয়সের শিশুর জন্য প্রযোজ্য, তা উল্লেখ থাকতে হবে এবং প্লাস্টিকের খেলনার ক্ষেত্রে তা ‘স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়’ মর্মে রপ্তানিকারক দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সনদের প্রয়োজন হবে। আগের আমদানি নীতিতে বেসামরিক বিমান বা হেলিকপ্টার আমদানির উল্লেখ না থাকলেও এবার তা যোগ হয়েছে।
স্ক্র্যাপ ভেসেল আমদানির ক্ষেত্রে শিপিং ডকুমেন্টের সঙ্গে ‘জাহাজে ইনবিল্ট দ্রব্যাদি ছাড়া অন্য কোনো বিষাক্ত বা বিপজ্জনক বর্জ্য পরিবহন করা হচ্ছে না’ মর্মে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র ও আমদানিকারকের ঘোষণাপত্র দাখিল করতে হবে। সব ধরনের যুদ্ধজাহাজ শুধু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তরবারি ও বেয়নেট ইত্যাদি পণ্য শুধু ব্যবহারকারী সংস্থা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের ভিত্তিতে আমদানি করা যাবে।