গ্রামীণ কৃষিপণ্যের হাট থেকে আজকের আধুনিক রেমিট্যান্স–নির্ভর ব্যবসা—স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক বিবর্তনের এক জীবন্ত চিত্র।
বর্ষার স্নিগ্ধ সকালে মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশপথে বাঁক নেওয়া মনু নদ পার হলেই শুরু হয় এক বিশাল বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ। নদের সমান্তরালে এম সাইফুর রহমান রোড (পুরোনো সেন্ট্রাল রোড) ধরে কিছুটা এগোলেই দেখা মেলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র পশ্চিম বাজারের। প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যকেন্দ্রের শিকড় প্রোথিত শত বছর আগের এক গ্রামীণ হাটের ইজারা প্রথা ও মনু নদকেন্দ্রিক বাণিজ্যের গভীরে।
বাজারের ভেতরে আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের দাপট বেশি চোখে পড়লেও আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো ‘সাধনা ঔষধালয়’ এবং আরও প্রাচীন টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ভবন। শতবর্ষী এই টেলিগ্রাফ ভবনের দেয়াল যেন সেকালের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গল্প বলে। একসময় যে মনু নদের ঘাটকে কেন্দ্র করে এখানকার ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়েছিল, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক নগরায়ণের চাপে আজ বাজার থেকে সেই নদের নাগাল পেতে বেশ খানিকটা পথ হাঁটতে হয়।
কালের পরিক্রমায় নদের পুরোনো লঞ্চঘাট হারিয়ে গেলেও পশ্চিম বাজার সময়ের সঙ্গে নিজেকে রূপান্তর করেছে। গ্রামীণ কৃষিপণ্যের হাট থেকে আজকের আধুনিক রেমিট্যান্স–নির্ভর ব্যবসাকেন্দ্রটি মৌলভীবাজারের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক বিবর্তনের এক জীবন্ত চিত্র।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইতিহাস-অনুরাগী সৈয়দ আবদুল মতালিব রঞ্জুর তথ্য অনুযায়ী, ১৮১০ সালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র হজরত ইয়াছিন (রহ.)-এর উত্তরসূরি জমিদার মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদের পশ্চিম তীরে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৯৩ সালে তিনি মুন্সেফ বা বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তাঁর নামানুসারে জনপদটি ‘মৌলভীবাজার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই জনপদ তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্টের অংশ ছিল।
শুরুর দিকে পশ্চিম বাজারে সপ্তাহে দুই দিন—সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসত। স্থানীয় কৃষকেরা তেল, চাল, ধান, তাজা সবজি, হাওরের মাছ, শুঁটকিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে আসতেন।
তখন হাটের রাজস্ব বা কর আদায়ের পদ্ধতিও ছিল আলাদা। ইজারাদার বা জমিদারেরা হাটে আসা বিক্রেতাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে খাজনা আদায় করতেন, যা স্থানীয় ভাষায় ‘তুলা’ নামে পরিচিত ছিল। এটিই ছিল হাটের আয়ের মূল উৎস। কৃষিপণ্যের বিনিময়ে বা নগদ অর্থে এই তুলা আদায় করা হতো এবং তা জমিদারদের মূলধন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখত।
বাণিজ্যিক কাঠামোর দিক থেকে পশ্চিম বাজারের নিজস্ব চরিত্র ছিল। পাশের উপজেলা শ্রীমঙ্গল ঐতিহাসিকভাবে চা ও কৃষিপণ্যের পাইকারি বাণিজ্যের হাব হিসেবে পরিচিত হলেও পশ্চিম বাজার শুরু থেকেই শক্তিশালী খুচরা বাজার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
সড়কপথের উন্নয়নের আগে এ অঞ্চলের ব্যবসার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। স্থানীয়দের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে মনুমুখ বাজারের কথা। মনু নদ কুশিয়ারা নদীতে যেখানে মিশেছে, সেখানে গড়ে ওঠা মনুমুখ বাজারের কাছে অতীতে একটি লঞ্চঘাট ছিল। এই ঘাটকে কেন্দ্র করে কুশিয়ারা নদী হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় বাণিজ্যিক হাবের সঙ্গে লঞ্চ ও স্টিমারে পণ্য পরিবহন হতো।
এই নদীপথের বাণিজ্যের বড় অংশজুড়ে ছিল ‘সোনালি আঁশ’ পাট। মনুমুখ লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে পাটের বড় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করার পর তা নৌপথে নারায়ণগঞ্জ বা ভারতে পাঠানো হতো। পাটের ব্যবসার কারণে তখন এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
পাটের পাশাপাশি কাঠের ব্যবসাও ছিল অর্থনীতির আরেক স্তম্ভ। রাজকান্দি সংরক্ষিত বন, জুড়ী বন বিভাগ ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকার গাছ কাটা হতো। গাছ কেটে প্রায় ১৫ ফুট লম্বা লগ তৈরি করে হাতি দিয়ে টেনে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে ঘাটে আনা হতো। চা-শিল্পের প্যাকিং বাক্স তৈরিতেও শিমুল, আম, কদম ও হারিশগাছ ব্যবহৃত হতো। ১৯৮৯ সালে সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার পর কাঠের ব্যবসায় ভাটা পড়ে। একই সময়ে নদী ভরাট হয়ে নৌ-বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়।
পাট ও কাঠের সেই ব্যবসা এখন নেই, বন্ধ নদীপথও। তবে পশ্চিম বাজারের অর্থনীতি থেমে যায়নি। বরং তা রূপ নিয়েছে রেমিট্যান্স–নির্ভর আধুনিক খুচরা বাজারে।
বর্তমান পশ্চিম বাজার উৎসবনির্ভর কোনো বাজার নয়। দেশের অনেক বাজার যেখানে ঈদ বা পূজার দিকে তাকিয়ে থাকে, পশ্চিম বাজারে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ও তাঁদের দেশে ফেরার সময়ের বেচাকেনা বড় ভূমিকা রাখে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রিপন সরদারের ভাষায়, ‘এই এলাকায় মানুষের হাতে পয়সা আছে। তাই বাজার চলে।’
ইউরোপ-আমেরিকায় গ্রীষ্ম বা শীতকালীন ছুটি শুরু হলে দলে দলে প্রবাসী দেশে ফেরেন। তখন পশ্চিম বাজারের ব্যবসাও বাড়ে। তাঁদের রুচি ও ক্রয়ক্ষমতা মাথায় রেখে দোকানগুলোর সাজসজ্জা ও ব্র্যান্ডিংয়েও পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপ-আমেরিকার বিপণিবিতানের আদলে অনেক দোকানে আধুনিক ইন্টেরিয়র দেখা যায়। বাজারের কেন্দ্রের শপিং মলগুলোও মানসম্মত পণ্যের জন্য ক্রেতাদের কাছে বিশ্বস্ত।
কসমেটিকস ও পোশাক ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার বলেন, ‘আমাদের ব্যবসার মূল প্রাণই হলো প্রবাসীরা।’ লন্ডন-আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাঁরা ছুটিতে এলে বেচাকেনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাঁদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি ব্র্যান্ডের আদলে পণ্য সাজানো হয়।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স পশ্চিম বাজারের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি। দৈনিক কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানির এলসি খোলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙানোর সুবিধার জন্য পশ্চিম বাজার ও এম সাইফুর রহমান রোড এলাকায় এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকসহ দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের শাখা এবং এক্সচেঞ্জ হাউস গড়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ক্রেতা ফয়সল আহমেদ বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই বাজারে আসতেন। তখন বাজারটি অনেক সাদামাটা ছিল। এখন আধুনিক শপিং মলের সাজসজ্জা ভালো লাগে। তবে বাজারের পরিধি বাড়লেও হাঁটার পরিবেশ ও পার্কিং–সুবিধা সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি।
প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যকেন্দ্রের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজারের কয়েকটি মালিক সমিতি, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কাঠের প্রাচুর্যের কারণে পশ্চিম বাজারে একসময় কাঠের ফার্নিচার ও বাদ্যযন্ত্র তৈরির শিল্প গড়ে ওঠে। বাদ্যযন্ত্রের বাজার এখনো টিকে আছে। ‘আলো মিউজিক সেন্টার’-এর মালিক পিঙ্কু দাস জানান, একটি হারমোনিয়াম বানাতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। দাম ১২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। আকাশমণি, গামারি, কেরোসিন, মেহগনি ও সেগুন কাঠ দিয়ে এসব তৈরি হয়। তবে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পীরা মূলধনসংকটে ভুগছেন।
পশ্চিম বাজারে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের আরেকটি নিদর্শন বেতের ফার্নিচার। শিফা কেইন ফার্নিচারের দোকানে সোফা, চেয়ার, দোলনা, মোড়া ও নানা ধরনের বেতের আসবাব পাওয়া যায়। একসময় বৃহত্তর সিলেট বাঁশ ও বেতশিল্পের জন্য পরিচিত হলেও কাঁচামালের অভাব এবং আধুনিক প্লাস্টিক-বোর্ডের আসবাবের দাপটে শিল্পটি হুমকির মুখে। স্বত্বাধিকারী শাহিন মিয়া জানান, পরিবেশবান্ধব ও কারুকার্যময় এসব আসবাব এখনো শৌখিন ক্রেতা এবং বিশেষ করে দেশে আসা প্রবাসীদের আকর্ষণ করে।
কাঁচামালের অভাব, দক্ষ কারিগরের সংকট ও সস্তা বিকল্প আসবাবের কারণে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিসিকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ ও কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে বেতশিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, কৃষিপণ্যের বাজারও এখন বাইরের জেলার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কলার আড়তদার মোহাম্মদ আতাউর রহমান ও নূর মিয়া জানান, স্থানীয় উৎপাদন নগণ্য হওয়ায় সাগর, সবরি ও চাঁপা কলার প্রায় পুরোটাই রাজশাহী ও বগুড়া থেকে আসে। বিভিন্ন আয়োজনে ব্যবহৃত পান আসে বরিশাল থেকে। একসময় যে বাজার তিসি, কাউন ও চিনার মতো কৃষিপণ্য রপ্তানি করত, এখন তা অন্য জেলার ওপর নির্ভরশীল।
পশ্চিম বাজারের পাইকারি মৎস্য আড়তে বৃহত্তর সিলেটের মৎস্য অর্থনীতির চিত্রও দেখা যায়। একসময় হাইল হাওর বা হাকালুকির প্রাকৃতিক মাছের ওপর বাজারটি অনেকটাই নির্ভরশীল থাকলেও এখন ৯০-৯৫ শতাংশ মাছই আসে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা পুকুর থেকে।
স্থানীয় আড়তদারদের মতে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত মৌসুমে হাওর-বিলের প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যায়। বছরের বাকি সময় বাণিজ্যিক মৎস্য খামারগুলোই বাজারের মূল চালিকা শক্তি। প্রতিদিন ভোর থেকে আড়তে কোটি টাকার মাছ নিলামে বেচাকেনা হয়। এসব মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও রেস্তোরাঁয় যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যের এত প্রসার থাকলেও শহরে অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। শহরের বিসিক শিল্প এলাকার অবস্থা করুণ। দু-তিনটি স্থানীয় বেকারি কোনোমতে টিকে থাকলেও বেশ কিছু কারখানা পরিত্যক্ত। ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেও অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে শহরে যানজটও লেগে থাকে। মুদি ও কৃষিপণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী সুধীর চন্দ্র বলেন, রাস্তাঘাট বেহাল হওয়ার কারণে মালবাহী ট্রাক বাজারে ঢোকাতে কষ্ট হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে।
মনু নদের তীরের পশ্চিম বাজার তাই শুধু পণ্য কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি মৌলভীবাজারের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত মানচিত্র। জমিদারদের ‘তুলা’ আদায়ের হাট থেকে পাট ও কাঠের ব্যবসা, সেখান থেকে আজকের রেমিট্যান্স–নির্ভর আধুনিক খুচরা বাজার—সময় ও অর্থনীতির সঙ্গে পশ্চিম বাজারও বদলে গেছে।
একদিকে আধুনিক শপিং মল, ইউরোপীয় ধাঁচের বিপণিবিতান ও ব্যাংকের সারি; অন্যদিকে কাঠের বাদ্যযন্ত্রের দোকান, কলার আড়ত, মাছের বাজার, পানের দোকান, মুদিদোকান—সব মিলিয়ে পশ্চিম বাজারে ঐতিহ্য ও আধুনিক বাণিজ্যের সহাবস্থান। ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা, প্রশস্ত রাস্তাঘাট ও পরিত্যক্ত বিসিক নগরীর মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে মনুতীরের এই বাজার আগামী দিনেও বৃহত্তর সিলেটের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হয়ে থাকতে পারে।