নৌশিন ফারজানা হুদা চৌধুরী
নৌশিন ফারজানা হুদা চৌধুরী

কেমন বাজেট চাই

সংখ্যার বাজেট নয়, সংকট উত্তরণের রূপরেখা চাই 

কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের চরম উদ্বেগ ও ভোগান্তি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। তাই নতুন সরকারের নতুন বাজেট সামনে রেখে চাকরিজীবী থেকে শুরু করে শ্রমজীবীসহ সাধারণ মানুষ চান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসুক। ব্যবসায়ীরা চান ব্যবসার পরিবেশ সহজ হোক, শুল্ক–করের চাপ কমুক। তরুণেরা চান শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাত উন্নত হোক। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গৃহিণী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার ছয়জনের বাজেট প্রত্যাশা নিয়ে এ আয়োজন।

নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে নতুন বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্ববাজারে তেল, কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার–সংকটের কারণে বিগত বাজেটগুলোতে সরকারকে বেশ কিছু কঠোর ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এখন সেই পদক্ষেপগুলোর ফলাফল ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় বাস্তবতা বিবেচনায় জ্বালানিনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে কর ও শুল্ককাঠামোয় উল্লেখযোগ্য ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। রুফটপ সোলার ও গ্রিড-টাইড সোলার সিস্টেমের যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ব্যাটারির ওপর আমদানি শুল্ক কমালে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) এবং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে স্থলভাগ ও গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাজেটে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জ্বালানি অনুসন্ধান তহবিল’ রাখা উচিত।

অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতি আর সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা যাবে না। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। তবে সেই বরাদ্দ কেবল অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ জোরদারেও বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বর্তমান পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে বাড়ানোর একটি সুস্পষ্ট পথনকশা থাকা দরকার। অন্তত সাড়ে ৩ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কেবল সংখ্যার একটি বাজেট নয়; বরং এমন একটি অর্থনৈতিক রূপরেখা দিতে হবে, যেটি সাহসী, সংস্কারমুখী ও বাস্তবসম্মত। আসন্ন বাজেটে জ্বালানিনিরাপত্তা ও শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই সরকারের দূরদর্শিতার প্রকৃত পরিচয় বহন করবে।


নৌশিন ফারজানা হুদা চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়