এলপিজি আমদানিতে শীর্ষে ওমেরা, বড় উৎস যুক্তরাষ্ট্র

দেশে বছরে যে পরিমাণ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হয়, তার ৭৬ শতাংশই আনে চারটি কোম্পানি। সেগুলো হচ্ছে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ওমেরা পেট্রোলিয়াম, নেদারল্যান্ডসের পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা গ্রুপের মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার ও বিএম এনার্জি (বিডি)।

সর্বোচ্চ পরিমাণ এলপিজি আমদানি করে ওমেরা পেট্রোলিয়াম। তারা আনে মোট আমদানির ১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ আমদানি করে পেট্রোম্যাক্স এলপিজি। মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ও যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের হিস্যা ১৬ শতাংশ করে।

এক বছরে বাংলাদেশে ১২৭ কোটি ৩৮ লাখ মার্কিন ডলারের এলপিজি আমদানি হয়, যা স্থানীয় মুদ্রায় ১৫ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সদ্য সমাপ্ত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে এলপিজি আমদানির বিপরীতে এলসি বা ঋণপত্র খোলার হিসাব পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে ওমেরা এলপিজির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন এই ব্যবসা শুরু করি, তখন আমাদের প্রক্ষেপণ ছিল দেশে একসময় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির বাজারটি বড় হবে। কারণ, গ্যাস–সংযোগ ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে না। আবার গ্যাসের ব্যবহার গৃহস্থালি পর্যায়ে বাড়ানো উচিত না। তাই আমরা গৃহস্থালি পর্যায়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করি।’

আজম জে চৌধুরী আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এলপিজি আমদানি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও দাম বেড়েছে। যুদ্ধ শেষ হলে বাজারের অস্থিরতাও কমে আসবে।

এলসি পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে আসা এলপিজির বড় উৎস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ওমান, ইরাক ও সৌদি আরব থেকেও বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়। মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৭৮ শতাংশের উৎস হলো এসব দেশ। তবে বাংলাদেশে এলপিজি রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুরের নাম। তাদের পেছনেই আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত। সব মিলিয়ে এই তিন দেশ থেকে আসে প্রায় ৬৮ শতাংশ এলপিজি। এসব দেশ উৎপাদনের পাশাপাশি এলপিজি বাণিজ্যেও জড়িত। সে কারণেই রপ্তানিকারকের তালিকায় তারা শীর্ষে রয়েছে।

বাংলাদেশে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) মূলত বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। এটি প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে সমুদ্রপথে বড় জাহাজে করে চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে আসে। আমদানির সময় এলপিজি চাপযুক্ত তরল অবস্থায় থাকে। পরে লাইটার জাহাজে ছোট টার্মিনালে খালাস করে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব টার্মিনাল বা শোধনাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সেই গ্যাস সিলিন্ডারে বোতলজাত করা হয় এবং ট্যাংকার বা বিশেষ যানবাহনের মাধ্যমে পরিবেশক ও বিক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।

কার হিস্যা কেমন

এক বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিতে হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বাজারের শীর্ষে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এক বছরে ২৩ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের এলপিজি আমদানি করেছে।

এরপর রয়েছে পেট্রোম্যাক্স এলপিজি। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি শেয়ার ১৭ শতাংশ। তারা বছরে মোট ২১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের এলপিজি আমদানি করেছে। মেঘনা গ্রুপের মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ১৬ শতাংশ এলপিজি আমদানি করেছে, যার বাজারমূল্য ২০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার।

যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের হিস্যাও ১৬ শতাংশ। তারা আমদানি করেছে ২০ কোটি ৪ লাখ ডলারের এলপিজি।

যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের বিপণন বিভাগের প্রধান লুতফর রায়হান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এলপিজি ব্যবসায়ে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে একটি। এলপিজি আমদানিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

স্মার্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বিএম এনার্জি (বিডি) আনে দেশের মোট এলপিজি আমদানির ৮ শতাংশ। যার দাম ১০ কোটি ২৫ লাখ ডলার।

ইউনাইটেড গ্রুপের ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি আমদানি করে ৭ শতাংশ বা ৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের এলপিজি। ২০২১ সালে তুরস্কের আইগ্যাস যৌথভাবে ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে এই ব্যবসা শুরু করে।

ডেল্টা এলপিজি আমদানি করে ৪ শতাংশ বা ৪ কোটি ৫১ লাখ ডলারের এলপিজি। চট্টগ্রামের টিকে গ্রুপের এই ব্যবসায়ে ২০২০ সালে বিনিয়োগ করে দেশের সিকম গ্রুপ।

জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস ও প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস ৩ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে। বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, এসকেএস এলপিজি ও টিএমএসএস এলপিজি আমদানি করে ২ শতাংশ করে।

দেশের মোট আমদানির ১ শতাংশ করে আনে পদ্মা এলপিজি, দুবাই বাংলা এলপি গ্যাস ও এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন।

এ ছাড়া এলপিজি আমদানির তালিকায় আরও রয়েছে সিটি এলপিজি, ইউনিভার্সাল গ্যাস অ্যান্ড গ্যাস সিলিন্ডার এবং গ্যাস অ্যান্ড গিয়ার বাংলাদেশ।

কোন দেশের এলপিজি কে আনে

ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ভারত এগিয়ে রয়েছে। তবে গ্যাসটির মূল প্রাকৃতিক উৎপত্তিস্থল হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউএই, ওমান, ইরাক ও সৌদি আরব।

দেশের ব্যবসায়ীরা বিশ্বের ১৮টি দেশের এলপিজি আমদানি করেন। গত এক বছরে যে এলপিজি আমদানি হয়েছে, তার ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশের উৎস হলো যুক্তরাষ্ট্র। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও ওমান থেকে ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশ এলপিজি আমদানি হয়েছে।

এ ছাড়া ইরাক থেকে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ, সৌদি আরব থেকে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ এলপিজি এসেছে।

অন্যান্য উৎস দেশের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ, থাইল্যান্ড থেকে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ, কুয়েত থেকে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুর থেকে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। অন্য উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার, আর্জেন্টিনা, কাজাখস্তান, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ভারত।

এসব দেশ এলপিজির উৎস হলেও পণ্যটি আমদানি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর মাধ্যমে। যেমন যেসব দেশ থেকে এলপিজি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির মাধ্যমে গত বছর ২৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের এলপিজি আমদানি হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ২৪ শতাংশ বা ৩৩ কোটি ৪২ লাখ ডলারের এলপিজি এসেছে। ভারত থেকে এসেছে ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ বা ১৫ কোটি ১৩ লাখ ডলারের।

এ ছাড়া থাইল্যান্ড থেকে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ, তুরস্ক থেকে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, ফ্রান্স থেকে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, মালয়েশিয়া থেকে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ইরাক থেকে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ওমান থেকে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং সৌদি আরব থেকে ২ শতাংশ এলপিজি আমদানি হয়েছে।

বাংলাদেশে আরও যেসব দেশের এলপিজি আমদানি হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নরওয়ে, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও অস্ট্রিয়া।