এলপিজি সিলিন্ডার
এলপিজি সিলিন্ডার

সংকটেও এলপিজি আমদানি বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চাহিদা অনুযায়ী প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। আবার তিন মাস আগে উদ্যোগ নিয়েও সরকার তরলীকৃত পেট্টোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির একটি চালানও আমদানি করতে পারেনি। তবে সংকটের সময়ে দেশের ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি করেছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি। আর এ সময়ে এলপিজির পুরোটাই এনেছে বেসরকারি খাত। এলপিজি আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রান্নার প্রয়োজনীয় এই গ্যাস সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা কম। তবে সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি এলেও এলপিজির দাম নিয়ে ভোক্তাদের জন্য কিছুটা দুশ্চিন্তা অপেক্ষা করছে। কারণ, বিশ্ববাজারে এপ্রিল মাসের জন্য সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব তেল কোম্পানি আরামকো এলপিজির দাম ৪৪ শতাংশ বাড়িয়েছে। আবার জাহাজভাড়াও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।

সৌদি আরামকোর মূল্য ধরে বাংলাদেশে ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিইআরসি গতকাল বৃহস্পতিবার এপ্রিল মাসের জন্য এলপিজির দাম নতুন করে নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাতে ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের এলপিজির দাম এপ্রিলে কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়েছে বিইআরসি। ফলে বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে এই দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। তার মানে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা।

* মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে আমদানি বাড়িয়েছি।–মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ * দুই মাস ধরে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বহুমুখী উৎস থেকে আমদানি করে এলপিজির সরবরাহ বাড়িয়েছেন। এপ্রিলের আমদানি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।–আমিরুল হক, সভাপতি, লোয়াব

বিইআরসি বলেছে, বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।

আমদানি বেড়েছে, তবে...

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত নভেম্বরে এলপিজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও আমদানি বাড়েনি। এতে জানুয়ারিতে বাজারে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দেয়। পরে সরকার ব্যবসায়ীদের আমদানির সহজ করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ায় ফেব্রুয়ারি থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১ লাখ ৭১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। মার্চে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার টনে। মার্চ মাসের আমদানি ফেব্রুয়ারির চেয়ে ৪০ হাজার টন বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও মার্চে এলপিজি আমদানিতে নেতৃত্ব দিয়েছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, ইউনাইটেড আইগ্যাস, যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার ও ওমেরা পেট্রোলিয়ামসহ অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) একাই প্রায় ৩৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরুর পর থেকেই বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে আমদানি বাড়িয়েছি। তাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দাম নয়, সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য।’

এলপিজি আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্চে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও এপ্রিলের চিত্র অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর। কারণ, দেশের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসে এই অঞ্চল থেকে।

জানতে চাইলে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দুই মাস ধরে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বহুমুখী উৎস থেকে আমদানি করে এলপিজির সরবরাহ বাড়িয়েছেন। এপ্রিল মাসের আমদানি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যাতে বাজারে সরবরাহ ঠিক থাকে।

সরকারি আমদানি শুন্য

সরকারি খাতে এলপিজি আমদানির কোনো অগ্রগতি হয়নি। সরকারি পর্যায়ে এলপিজির আমদানির জন্য জানুয়ারিতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কোনো সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি ৮টি দেশের ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র আহ্বান করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। যারা প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের দর বিপিসির প্রত্যাশার তুলনায় বেশি। যেখানে বিপিসি টনপ্রতি প্রায় ১০৫ মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম ধরেছিল, সেখানে প্রস্তাব এসেছে ১৫০ থেকে ১৯০ ডলারের মধ্যে।

জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কাঙ্ক্ষিত প্রিমিয়ামে এলপিজি সরবরাহের প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। এ জন্য এলপিজি আমদানি করতে আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে।