
চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, আদাসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর ঘোষণা বাজেটে।
চাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি থেকে শুরু করে জিরা, এলাচি, দারুচিনি—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে একগুচ্ছ কর-সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ও নিত্যপণ্যের ওপর করের চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন এবং শিশুখাদ্য শিল্পেও নতুন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে মসলাজাতীয় পণ্য। এসব পণ্যের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। একই সঙ্গে চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর ঘোষণা এসেছে।
গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়ের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, ধান, চাল, গম, আটা, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ বিভিন্ন কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ কমবে। সরকার আশা করছে, এর প্রভাব পড়বে শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারেও।
গত অর্থবছরে সব ধরনের ভোজ্যতেলে ১ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করা হয়েছিল। এবার তা অর্ধেকে নামিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকার শুধু ভোজ্যতেলের আমদানি পর্যায়ে কর কমাচ্ছে না, দেশীয় উৎপাদনও উৎসাহিত করতে চায়। এ জন্য বাজেটে দেশীয় তেলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পকে ধাপে ধাপে ১০ বছরের কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর শতভাগ, পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ এবং শেষ দুই বছর ২৫ শতাংশ কর অব্যাহতি থাকবে।
বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানি করা অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে। দেশীয় তেলবীজ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে এই নির্ভরতা কমাতে চায় সরকার।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, এই সুবিধা কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে এবং দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
দেশে উৎপাদিত প্রধান তেলবীজ হলো শর্ষে। এ ছাড়া সূর্যমুখী ও সয়াবিন বীজও উৎপাদন হচ্ছে। এসব বীজ মাড়াই করে দেশে তেল উৎপাদিত হয়। তবে দেশের মোট চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন এখনো খুবই কম। ফলে ভোজ্যতেলের বাজার এখনো আমদানিনির্ভর।
ভোজ্যতেলের উদ্যোক্তারা জানান, নতুন এই কর সুবিধার কারণে তেলবীজ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। যার সুফল পাবে কৃষক ও প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প।
করছাড়ের পরিমাণের বিচারে প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে মসলাজাতীয় পণ্য। নিত্যপণ্যের অন্য খাতে করহার কমানো হলেও মসলার ক্ষেত্রে পুরো নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। মসলাজাতীয় পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের এই হার বর্তমানে ৩ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এই খাত থেকে ৩১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে প্রতি কেজি জিরায় শুল্ক-কর কমবে প্রায় ১৬ টাকা। প্রতি কেজি লবঙ্গে কমবে প্রায় ১৮ টাকা। প্রতি কেজি দারুচিনিতে কমবে প্রায় ৮ টাকা। প্রতি কেজি কালো গোলমরিচে কমবে প্রায় ১৪ টাকা। গুয়াতেমালা থেকে আমদানি হওয়া এলাচে কমবে প্রায় ৬৮ টাকা। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নিত্যপণ্যে যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর-সুবিধা মসলাজাতীয় পণ্যে।
বাজেটে শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের আশা, কাঁচামাল আমদানিতে খরচ কমলে শিশুখাদ্যের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং বাজারে এসব পণ্য আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হবে।
বাজেটে শুল্ক-করের প্রস্তাবনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। ফলে নিত্যপণ্যে সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, তা গত বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। ফলে আমদানির ক্ষেত্রে এই ছাড়ের সুফল পাবেন প্রথমে আমদানিকারকেরা। এরপর বাজারজাত হলে ভোক্তারা সুবিধা পাওয়ার কথা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্ক-কর ছাড়ের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে আমদানিকারক, উৎপাদক ও বাজারজাতকারীরা সেই সুবিধা কতটা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেন তার ওপর। অতীতে কর কমলেও সব ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম কমেনি। ফলে এবারের করছাড় কতটা ভোক্তার পকেটে পৌঁছায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।