
দেশে প্রায় সোয়া এক কোটি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেরই কোনো ধরনের নিবন্ধন নেই। ফলে ব্যাংকঋণসহ নানা আনুষ্ঠানিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে এসব প্রতিষ্ঠান। তারা মূলত অনানুষ্ঠানিকভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তবে সংখ্যার বিচারে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য থাকলেও, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রধান ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এ এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এই শুমারির চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। শুমারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৩ সালে দেশে যেখানে অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ৭৮ লাখের বেশি, সেখানে তা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে ১ কোটি ১৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। সে মাসেই শুমারিটি করেছিল বিবিএস। তাতে দেখা যায়, দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ, যা মোট ইউনিটের প্রায় ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে নিবন্ধিত ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ বা ২৮ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ বা সাড়ে ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই।
সংখ্যার দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও দেশের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নিবন্ধিত খাতের অবদানই সবচেয়ে বেশি। মাত্র ২৮ শতাংশ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষের কাজের সংস্থান করেছে। অন্যদিকে প্রায় ৬৫ শতাংশ অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৭ শতাংশ মানুষের।
নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে ট্রেড লাইসেন্সসহ সব অনুমোদন এক ছাতার নিচে অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল ‘ওয়ান–স্টপ সার্ভিস’ সেবার অধীনে আনতে হবে। পাশাপাশি নতুন ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে জামানতমুক্ত ব্যাংকঋণ, প্রারম্ভিক করছাড় ও করপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা আবশ্যক।—তাসকীন আহমেদ, সভাপতি, ঢাকা চেম্বার
অর্থনৈতিক ইউনিট বলতে এমন কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেখানে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যবসা পরিচালিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য ও সেবা উৎপাদন, বিতরণ, বিপণন ও বিক্রি ইত্যাদি কার্যক্রম। ফুটপাত, হাট-বাজার অথবা রাস্তার পাশে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অস্থায়ী ছাউনির নিচে থাকা ছোটখাটো দোকানপাটও অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে হিসাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিবিএসের শিল্প ও শ্রম শাখার পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীর জানান, অর্থনৈতিক কাজ পরিচালনার জন্য যাঁদের ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসায়ী শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বা অনুরূপ কোনো নিবন্ধন রয়েছে, তাঁদের নিবন্ধিত হিসেবে গণনা করা হয়েছে। যাঁদের জন্য এসব লাইসেন্স বা নম্বর নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও নেননি, তাঁদের নিবন্ধনহীন বা অনিবন্ধিত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
শুমারিতে দেখা যায়, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ইউনিটের উপস্থিতি গ্রামের দিকেই বেশি। মোট ইউনিটের ৬৩ শতাংশ বা প্রায় ৭৪ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট গ্রামে এবং ৩৭ শতাংশ বা প্রায় ৪৩ লাখ শহরে অবস্থিত।
তবে গ্রামে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত মানুষের সংখ্যা শহর ও গ্রামে প্রায় সমান-সমান। শহরের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে গ্রামের চেয়ে তুলনামূলক বড় হওয়ায় সেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বেশি লোক কাজ করেন।
ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে নিবন্ধনের আওতায় এলে তাদের ব্যবসায়ের খরচ ও নিয়ম পালনের চাপ বেড়ে যাবে। আবার অনেকের মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাতের সুবিধা নিয়ে সচেতনতা ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় প্রথম করণীয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে নিয়ম পালনের চাপ ও খরচ কমিয়ে আনা।—এম মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ।
শহরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ, যেখানে কর্মী সংখ্যা প্রায় ৯৯ লাখ। আর গ্রামে নিবন্ধিত ইউনিট প্রায় ১৬ লাখ, কর্মী সংখ্যা ৬৭ লাখ।
অন্যদিকে গ্রামে অনানুষ্ঠানিক বা অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য বেশি। গ্রামে অনিবন্ধিত ইউনিট প্রায় ৫২ লাখ, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ। আর শহরে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান গ্রামের অর্ধেকের কম—প্রায় ২৪ লাখ, যেখানে কর্মী সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। অর্থাৎ গ্রামে অনিবন্ধিত কুটির ও অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হলেও সেগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত।
এর বাইরে গ্রামগঞ্জে এমন অনেক ব্যক্তিগত দোকান ও পারিবারিক ছোট অর্থনৈতিক কাজ রয়েছে, যাদের জন্য নিবন্ধন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। শুমারিতে দেখা গেছে, এ ধরনের ৮ লাখ ৬০ হাজার ইউনিটের মধ্যে ৭১ শতাংশই গ্রামে অবস্থিত।
অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই কুটির, মাইক্রো ও পরিবারকেন্দ্রিক হওয়ায় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে তারা নিবন্ধনের আওতায় আসতে চায় না বলে মনে করা হচ্ছেছে। কিন্তু অনিবন্ধিত থাকার কারণে তারা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ ও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে একদিকে এসব ব্যবসা কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মনে করে, ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিত থাকা জাতীয় অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে থাকছে এবং আনুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে ট্রেড লাইসেন্সসহ সব অনুমোদন এক ছাতার নিচে অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল ‘ওয়ান–স্টপ সার্ভিস’ সেবার অধীনে আনতে হবে। পাশাপাশি নতুন ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে জামানতমুক্ত ব্যাংকঋণ, প্রারম্ভিক করছাড় ও করপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা আবশ্যক।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে নিবন্ধনের আওতায় এলে তাদের ব্যবসায়ের খরচ ও নিয়ম পালনের চাপ বেড়ে যাবে। আবার অনেকের মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাতের সুবিধা নিয়ে সচেতনতা ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় প্রথম করণীয় হলো প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে নিয়ম পালনের চাপ ও খরচ কমিয়ে আনা।