
কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। প্রতিবছরই লক্ষ্যের চেয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্বঘাটতি থাকছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল ও করণীয় নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে জাতীয় রাজস্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ আয়োজন করেছে।
রাজস্ব সম্মেলনে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং শুল্ক—প্রতিটি বিভাগ থেকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এনবিআরের আয়কর বিভাগ যত টাকার রাজস্ব আদায় করে, এর সিংহভাগই আসে উৎসে কর থেকে। চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার উৎসে কর আদায় করতে চায় আয়কর বিভাগ। এ ছাড়া ৩২ হাজার কোটি টাকার অগ্রিম কর আদায়ের পরিকল্পনাও আছে। চলতি অর্থবছরে আয়কর বিভাগের ২ লাখ ২৩ হাজার টাকার কর আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে, যা গত অর্থবছরের প্রকৃত আদায় থেকে ৫৬ শতাংশ বেশি। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন কীভাবে হবে, তা নিয়ে সম্মেলনে আয়কর বিভাগ থেকে উপস্থাপনা দেওয়া হবে।
এনবিআরের সূত্রগুলো বলছে, আয়কর বিভাগের পরিকল্পনায় উৎসে কর ও অগ্রিম কর আদায়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এ দুই খাত থেকে আদায় বাড়ানো হবে ৫০ শতাংশের বেশি। আর ফাঁকি দেওয়া কর থেকে চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আদায় করা হবে।
এ ছাড়া এনবিআরের আয়কর বিভাগের বছরের পর বছর পড়ে থাকা আয়কর–সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে—এমন পরিকল্পনাও করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে অবিতর্কিত ৮০ শতাংশ বকেয়া কর আদায় করা হবে।
এনবিআর চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গত অর্থবছরে মোট আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। যদিও এ লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বলেছেন অর্থনীতিবিদেরা। তবে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে পথনকশা তৈরি করেছে এনবিআর।
গত অর্থবছরে ভ্যাট আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা।
এর লক্ষ্য আদায়ে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। সেই উপস্থাপনার খসড়া অনুসারে, ভ্যাট বিভাগের পরিকল্পনা হলো ১০ শতাংশ স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ধরে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আদায় করা হবে। এ ছাড়া বিড়ি-সিগারেট খাত থেকে ১২ হাজার কোটি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুরোপুরি বাস্তবায়ন বাড়লে ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভ্যাট আদায় করা হবে। ভ্যাট ফাঁকি রোধ করে অতিরিক্ত ৩৮ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। বকেয়া আদায়সহ মোট ৯৯ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভ্যাট নিবন্ধন বৃদ্ধিতেও জোর দেওয়া হবে।
সারা বিশ্বের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এমন দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬-৭ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করে। এনবিআর নতুন লক্ষ্য ঠিক করেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কাল সকাল ১০টায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হবে রাজস্ব সম্মেলন। এতে এনবিআরের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য দেবেন সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। পরে মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুল্ক-কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় করার কথা আছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। রাজস্ব সম্মেলন প্রাঙ্গণে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের আলাদা স্টল থাকবে।
নাম প্রকাশ না করে এনবিআরের একজন সদস্য বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা নিশ্চিতভাবেই আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। তা ছাড়া বড় লক্ষ্য অর্জনে এনবিআরের সক্ষমতার বিষয়েও সরকারপ্রধানকে অবহিত করা হবে।’