জ্বালানি তেল
জ্বালানি তেল

যুদ্ধের কারণে বেড়েছে তেলের দাম, কমেছে এশিয়ার শেয়ার সূচক

সপ্তাহের শুরুটা বিশ্ববাজারের জন্য স্বস্তির হলো না। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার খবরের সঙ্গে ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ খবরে মুহূর্তেই চাঙা হয়ে ওঠে তেলের বাজার, চাপের মুখে পড়ে শেয়ারবাজার।

আজ সোমবার সকালে এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারসূচক নিম্নমুখী। সেই সঙ্গে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ে মুদ্রা ও বন্ডবাজারেও। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের খোঁজ করেন। ডলারের দাম বেড়ে যায়, সঙ্গে বাড়ে মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদহার।

বাজারে এখন ধারণা, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নতুন করে বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে আবারও সুদহার বাড়াতে পারে। এমন সময় ফেডের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ মঙ্গলবার এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেবেন। তাঁর বক্তব্যের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ববাজার।

এদিকে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হওয়ার কথা। জ্বালানির দাম আগের কয়েক সপ্তাহে কিছুটা কমে আসায় মূল্যস্ফীতিও হয়তো সামান্য কমতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় সেই স্বস্তি বেশি দিন টিকবে না।

আজ সোমবার সকালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একলাফে ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে উঠেছে। কয়েক দিন আগেও এর দাম ছিল ৭০ দশমিক ১৪ ডলার। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উদ্বেগের মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করানো হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, এই পথে চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের বড় নজর এখন করপোরেট পরিসংখ্যানের দিকে। মঙ্গলবার থেকে বড় বড় মার্কিন ব্যাংক চলতি প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এর পরপরই নেটফ্লিক্স ও জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো প্রতিষ্ঠানও আয়ের তথ্য প্রকাশ করবে।

অনেকের আশা, কোম্পানিগুলোর ভালো মুনাফার খবরে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমতে পারে।

বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির বিশ্লেষকেরা অবশ্য এখনো প্রযুক্তি খাত নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) শেয়ারে অস্থিরতা থাকলেও এই খাতে ভালো মুনাফা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এসব কোম্পানির মূল্যায়ন ভালো। এসব কারণে এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা অক্ষুণ্ন আছে।

তবে দিনের শুরুতে শেয়ারবাজারে সেই আশাবাদের প্রতিফলন দেখা যায়নি। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক ফিউচার নিম্নমুখী ছিল। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলোর ফিউচারও নিম্নমুখী। জাপানের নিক্কেই সূচক টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বড় পতনের মুখে পড়েছে। জাপান ছাড়া এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারের এমএসসিআই সূচকও নেমে যায়।

তেলের দাম কত বাড়বে

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় নেমে এসেছিল। এরপর তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম দফা হামলা চালানোর আগে যে দাম ছিল, আজ সোমবার মূল্যবৃদ্ধির পর তেলের দাম সেই তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। খবর আল-জাজিরার

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেব মনে করেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকবে।

গত শনিবার গ্রাহকদের উদ্দেশে দেওয়া এক নোটে সহদেব বলেন, এ সময়ের মধ্যে তেলের দামে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যেতে পারে, তবে তা এই সীমার মধ্যেই থাকবে।

সহদেব আরও বলেন, দূরপাল্লার জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে শোধনাগারগুলোকে কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সে কারণে তারা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতা কিছুটা হ্রাস করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনায় সেই প্রবণতা আরও জোরালো হবে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইজির বাজার–বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপও মনে করেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও তেলের দাম যে আবার ১০০ ডলার চাড়িয়ে যাবে, তেমন সম্ভাবনা কম।

আজ প্রকাশিত এক নোটে ফ্যাবিয়েন ইয়িপও বলেন, জুন মাসে তেলের দাম যে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গেল, তার পেছনে বাজারের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা যতই নাজুক হোক, তা টিকে থাকবে। তবে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় প্রমাণিত হয়েছে, সে ধারণার ভিত্তি কতটা ভঙ্গুর ছিল।

এদিকে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বন্ডবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ফলে ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সোনার আকর্ষণ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমে এসেছে।